প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর পালিত হয় ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’। বর্তমান সময়ে আত্মহত্যার মতো একটি স্পর্শকাতর ও করুণ সামাজিক ব্যাধি আমাদের সমাজে নীরব মহামারির রূপ নিয়েছে- যা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেন- যার একটি বড় অংশ ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। আমাদের দেশেও তরুণ সমাজ তথা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে প্রতিদিন গড়ে বহু মানুষ আত্মহত্যার শিকার হচ্ছেন, যার একটি বড় অংশ ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি তরুণ-তরুণী। এই পরিসংখ্যান কেবল কিছু সংখ্যার হিসাব নয়, একেকটি সম্ভাবনাময় তাজা প্রাণের অকাল ঝরে যাওয়ার করুণ দলিল, যা আমাদের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর এক গভীর ব্যর্থতা ফুটিয়ে তোলে।
বলা বাহুল্য, আত্মহত্যার পেছনে মূলত কাজ করে তীব্র মানসিক অবসাদ, পারিবারিক সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন, বেকারত্ব এবং একাডেমিক বা ভবিষ্যৎ জীবনের অতিরিক্ত চাপ। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হতাশা সহ্য করার ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং নিজেদের মনের কথাগুলো খোলাখুলি শেয়ার করার মতো আস্থার পরিবেশের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এর পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজে এখনো এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা বা ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে। ফলে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সময়মতো পেশাদার কাউন্সেলিং বা চিকিৎসা নিতে দ্বিধাবোধ করেন। অনেক সময় পরিবার বা সমাজ তাদের সমস্যাটিকে সহানুভূতি দিয়ে না দেখে বিচার করতে শুরু করে, যা ভুক্তভোগীকে আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে তোলে এবং চরম পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কেবল শোক প্রকাশ বা দিবসকেন্দ্রিক আলোচনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা। মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে এবং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে এমন হেল্পলাইন বা হটলাইন সেবা আরও সহজলভ্য ও প্রচারমুখী করা জরুরি- যাতে সংকটকালে যে কেউ পেশাদার সাহায্য পেতে পারেন।
বলার অপেক্ষা রাখে না, আত্মহত্যা কোনো অপরাধ নয়, বরং একটি মানসিক নিরাময়যোগ্য সংকট- এই ধারণার পরিবর্তন ঘটিয়ে আমাদের প্রতিটি মানুষের পাশে সহানুভূতিশীল বন্ধু হিসেবে দাঁড়াতে হবে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রয়োজন একটি সংবেদনশীল সমাজ ও শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষাবলয়। প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই যুগে পারস্পরিক দূরত্ব ও একাকীত্ব কাটিয়ে পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীদের মধ্যে সুসম্পর্ক এবং সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি জীবন অমূল্য। তাই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কার ভেঙে এমন এক নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলি- যেখানে কেউ নিজেকে একা বা অসহায় মনে করবে না এবং প্রত্যেকেই খুঁজে পাবে বেঁচে থাকার নতুন প্রেরণা।
কেএমএএ/আপ্র/১০.০৯.২০২৬