গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

আইনের ফাঁক বন্ধ না হলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি থামবে না

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৩:০৩ পিএম, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ০৫:০১ এএম ২০২৬
আইনের ফাঁক বন্ধ না হলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি থামবে না
ছবি

ফাইল ছবি

একজন অপরাধীকে গ্রেফতার করা পুলিশের সাফল্য হতে পারে; কিন্তু একই অপরাধী যদি কিছুদিন পর আবারো একই অপরাধে ফিরে আসে, তবে সেটি আর সাফল্যের গল্প থাকে না—বরং রাষ্ট্রের অপরাধ দমনব্যবস্থার কোথাও গভীর ফাটল থাকার ইঙ্গিত দেয়। পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকিরের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই অস্বস্তিকর সত্যটিই আমাদের সামনে নতুন করে হাজির করেছে। মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারীদের একাধিকবার আইনের আওতায় আনার পরও আইনের সীমাবদ্ধতা কিংবা জামিনের সুযোগে তারা বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। প্রশ্ন হলো, আইন কি তবে অপরাধীর জন্য শুধু একটি ঘূর্ণায়মান দরজা—যে দরজা দিয়ে সে ঢোকে, বের হয় এবং আবার ফিরে আসে?

জামিন আইনের স্বীকৃত অধিকার। কিন্তু সেই অধিকারের প্রয়োগ আর সমাজের নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একজন পুনরাবৃত্ত অপরাধীর ঝুঁকি যদি উপেক্ষিত হয়, তার বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত দুর্বল থাকে, বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয় কিংবা অপরাধের পর অপরাধ করেও সে একই ব্যবস্থার সুযোগ নিতে থাকে, তাহলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষয়ে যায়। আরো ভয়াবহ হলো, সেই শিথিলতার মূল্য দিতে হয় নিরপরাধ মানুষকে। জামিনে বের হয়ে ছিনতাই করতে গিয়ে একজন শিক্ষক হত্যার ঘটনাটি তাই কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের সতর্ক করে দেয়—ব্যবস্থার একটি ছোট দুর্বলতাও কখনো কখনো একটি পরিবারের জন্য আজীবনের অন্ধকার হয়ে উঠতে পারে।

অপরাধ দমনকে তাই গ্রেফতারের সংখ্যার সাফল্যে মাপলে চলবে না। কতজন গ্রেফতার হলো, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—কতজন পুনরায় অপরাধে ফিরল এবং কেন ফিরল। তদন্তের মান, রাষ্ট্রপক্ষের প্রস্তুতি, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, পুনরাবৃত্ত অপরাধের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং কারাগার থেকে মুক্তির পর নজরদারি—সবকিছুকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। আইনের ফাঁক থাকলে তা বন্ধ করতে হবে; কিন্তু সেই কাজ করতে গিয়ে যেন নাগরিকের ন্যায়সংগত অধিকারও ক্ষুণ্ন না হয়। শক্ত রাষ্ট্র মানে শুধু কঠোর রাষ্ট্র নয়, বরং ন্যায়সংগত ও কার্যকর রাষ্ট্র।

অন্যদিকে পুলিশের একার পক্ষে এই লড়াই জেতা সম্ভব নয়। প্রায় এক হাজার মানুষের জন্য একজন পুলিশ সদস্য—এই বাস্তবতায় পুলিশের ওপর অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তার পুরো দায় চাপিয়ে দেওয়া অবাস্তব। প্রয়োজন জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ শনাক্তকরণ এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কার্যকর অংশীদারত্ব। পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা যেমন জরুরি, তেমনি পুলিশেরও জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকা জরুরি। জুলাই বিপ্লবের পর কোথাও কোথাও পুলিশের প্রতি যে প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করে নয়, বরং তার কারণ অনুধাবন করেই আস্থার নতুন সেতু নির্মাণ করতে হবে।

মাদকের প্রশ্নটি আরো গভীর। ইয়াবাসহ নানা মাদক আকর্ষণীয় নামের আড়ালে তরুণদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। মাদক কেবল একজন তরুণকে গ্রাস করে না; ধীরে ধীরে একটি পরিবারকে ভেঙে দেয়, কখনো কখনো সহিংসতার জন্ম দেয়। তাই মাদকবিরোধী অভিযানকে শুধু গ্রেফতারনির্ভর না রেখে সরবরাহপথ বন্ধ, কারবারের অর্থের উৎস শনাক্ত, দ্রুত বিচার, আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং পরিবারভিত্তিক সচেতনতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

নিরাপদ সমাজের বীজ অবশ্য আরো আগে বপন করতে হয়। শিক্ষার্থীদের শুধু ভালো ফলের প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সততা, মানবিকতা, বিনয়, শৃঙ্খলা ও সামাজিক দায়িত্ববোধে তাদের গড়ে তুলতে হবে। পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ রক্ষা ও স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান তাই নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়, নাগরিক চরিত্র নির্মাণের অংশ। প্রযুক্তি যেন মানুষ ব্যবহার করে, মানুষ যেন প্রযুক্তির হাতে ব্যবহৃত না হয়—নতুন প্রজন্মের জন্য এই সতর্কতাটিও সমান জরুরি।

সড়কে শৃঙ্খলা শেখানো থেকে মাদক প্রতিরোধ, পুলিশ-জনগণের আস্থা থেকে বিচারব্যবস্থার সংস্কার—সবগুলো বিষয় আসলে একই সুতোয় বাঁধা। সেই সুতোর নাম দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব এবং কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা। অপরাধীকে বারবার গ্রেফতার করে আবার একই পথে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়। রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন অপরাধের দরজা বন্ধ হয়, ন্যায়বিচারের পথ প্রশস্ত হয় এবং সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাকে কাগজের প্রতিশ্রুতি নয়, প্রতিদিনের বাস্তবতা হিসেবে অনুভব করে। 
সানা/আপ্র/৭/৯/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ডিজে পার্টিসহ মাদক ব্যবসায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করুন
২২ অক্টোবর ২০২৬

ডিজে পার্টিসহ মাদক ব্যবসায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করুন

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার বাসায় ডিজে পার্টির আড়ালে মাদক সেবন, মাদক ব্য...

প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক পূজামণ্ডপ সফর: সমানাধিকারের বার্তা
২২ অক্টোবর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক পূজামণ্ডপ সফর: সমানাধিকারের বার্তা

রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার প্রশাসনিক কর্তৃত্বে নয়, প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমান অধিকার ন...

সড়কে অপরাধীদের দাপট, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা কোথায়?
২১ অক্টোবর ২০২৬

সড়কে অপরাধীদের দাপট, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা কোথায়?

রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দেওয়া। অথচ দেশের বিভিন...

আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি, ঋণের ফাঁদে বিপন্ন জনজীবন
২০ অক্টোবর ২০২৬

আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি, ঋণের ফাঁদে বিপন্ন জনজীবন

পরিবারের আয় দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানো মানুষের মৌলিক আর্থিক নিরাপত্তার শর্ত। অথচ দেশের ৪৭ দশমিক ৪২...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পতিত স্বৈরাচার ও বিরোধী দল বিশৃঙ্খলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত: প্রধানমন্ত্রী

দেশের বিভিন্ন স্থানে ও কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির পেছনে পলাতক স্বৈরাচার ও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ বিষয়ে তাঁর কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে দাবি করে তিনি বলেছেন, এক পক্ষ সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করছে, অন্য পক্ষ দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে