গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

আইনের ফাঁক বন্ধ না হলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি থামবে না

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৩:০৩ পিএম, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৩:৪০ এএম ২০২৬
আইনের ফাঁক বন্ধ না হলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি থামবে না
ছবি

ফাইল ছবি

একজন অপরাধীকে গ্রেফতার করা পুলিশের সাফল্য হতে পারে; কিন্তু একই অপরাধী যদি কিছুদিন পর আবারো একই অপরাধে ফিরে আসে, তবে সেটি আর সাফল্যের গল্প থাকে না—বরং রাষ্ট্রের অপরাধ দমনব্যবস্থার কোথাও গভীর ফাটল থাকার ইঙ্গিত দেয়। পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকিরের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই অস্বস্তিকর সত্যটিই আমাদের সামনে নতুন করে হাজির করেছে। মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারীদের একাধিকবার আইনের আওতায় আনার পরও আইনের সীমাবদ্ধতা কিংবা জামিনের সুযোগে তারা বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। প্রশ্ন হলো, আইন কি তবে অপরাধীর জন্য শুধু একটি ঘূর্ণায়মান দরজা—যে দরজা দিয়ে সে ঢোকে, বের হয় এবং আবার ফিরে আসে?

জামিন আইনের স্বীকৃত অধিকার। কিন্তু সেই অধিকারের প্রয়োগ আর সমাজের নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একজন পুনরাবৃত্ত অপরাধীর ঝুঁকি যদি উপেক্ষিত হয়, তার বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত দুর্বল থাকে, বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয় কিংবা অপরাধের পর অপরাধ করেও সে একই ব্যবস্থার সুযোগ নিতে থাকে, তাহলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষয়ে যায়। আরো ভয়াবহ হলো, সেই শিথিলতার মূল্য দিতে হয় নিরপরাধ মানুষকে। জামিনে বের হয়ে ছিনতাই করতে গিয়ে একজন শিক্ষক হত্যার ঘটনাটি তাই কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের সতর্ক করে দেয়—ব্যবস্থার একটি ছোট দুর্বলতাও কখনো কখনো একটি পরিবারের জন্য আজীবনের অন্ধকার হয়ে উঠতে পারে।

অপরাধ দমনকে তাই গ্রেফতারের সংখ্যার সাফল্যে মাপলে চলবে না। কতজন গ্রেফতার হলো, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—কতজন পুনরায় অপরাধে ফিরল এবং কেন ফিরল। তদন্তের মান, রাষ্ট্রপক্ষের প্রস্তুতি, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, পুনরাবৃত্ত অপরাধের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং কারাগার থেকে মুক্তির পর নজরদারি—সবকিছুকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। আইনের ফাঁক থাকলে তা বন্ধ করতে হবে; কিন্তু সেই কাজ করতে গিয়ে যেন নাগরিকের ন্যায়সংগত অধিকারও ক্ষুণ্ন না হয়। শক্ত রাষ্ট্র মানে শুধু কঠোর রাষ্ট্র নয়, বরং ন্যায়সংগত ও কার্যকর রাষ্ট্র।

অন্যদিকে পুলিশের একার পক্ষে এই লড়াই জেতা সম্ভব নয়। প্রায় এক হাজার মানুষের জন্য একজন পুলিশ সদস্য—এই বাস্তবতায় পুলিশের ওপর অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তার পুরো দায় চাপিয়ে দেওয়া অবাস্তব। প্রয়োজন জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ শনাক্তকরণ এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কার্যকর অংশীদারত্ব। পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা যেমন জরুরি, তেমনি পুলিশেরও জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকা জরুরি। জুলাই বিপ্লবের পর কোথাও কোথাও পুলিশের প্রতি যে প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করে নয়, বরং তার কারণ অনুধাবন করেই আস্থার নতুন সেতু নির্মাণ করতে হবে।

মাদকের প্রশ্নটি আরো গভীর। ইয়াবাসহ নানা মাদক আকর্ষণীয় নামের আড়ালে তরুণদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। মাদক কেবল একজন তরুণকে গ্রাস করে না; ধীরে ধীরে একটি পরিবারকে ভেঙে দেয়, কখনো কখনো সহিংসতার জন্ম দেয়। তাই মাদকবিরোধী অভিযানকে শুধু গ্রেফতারনির্ভর না রেখে সরবরাহপথ বন্ধ, কারবারের অর্থের উৎস শনাক্ত, দ্রুত বিচার, আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং পরিবারভিত্তিক সচেতনতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

নিরাপদ সমাজের বীজ অবশ্য আরো আগে বপন করতে হয়। শিক্ষার্থীদের শুধু ভালো ফলের প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সততা, মানবিকতা, বিনয়, শৃঙ্খলা ও সামাজিক দায়িত্ববোধে তাদের গড়ে তুলতে হবে। পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ রক্ষা ও স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান তাই নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়, নাগরিক চরিত্র নির্মাণের অংশ। প্রযুক্তি যেন মানুষ ব্যবহার করে, মানুষ যেন প্রযুক্তির হাতে ব্যবহৃত না হয়—নতুন প্রজন্মের জন্য এই সতর্কতাটিও সমান জরুরি।

সড়কে শৃঙ্খলা শেখানো থেকে মাদক প্রতিরোধ, পুলিশ-জনগণের আস্থা থেকে বিচারব্যবস্থার সংস্কার—সবগুলো বিষয় আসলে একই সুতোয় বাঁধা। সেই সুতোর নাম দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব এবং কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা। অপরাধীকে বারবার গ্রেফতার করে আবার একই পথে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়। রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন অপরাধের দরজা বন্ধ হয়, ন্যায়বিচারের পথ প্রশস্ত হয় এবং সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাকে কাগজের প্রতিশ্রুতি নয়, প্রতিদিনের বাস্তবতা হিসেবে অনুভব করে। 
সানা/আপ্র/৭/৯/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

বারবার বলতে হবে না ‘সংখ্যালঘু নন’, রাষ্ট্রের আচরণই তাঁকে অনুভব করাক—তিনি সত্যিই সমান
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বারবার বলতে হবে না ‘সংখ্যালঘু নন’, রাষ্ট্রের আচরণই তাঁকে অনুভব করাক—তিনি সত্যিই...

জন্মাষ্টমীর পবিত্র দিনে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের একটি উচ্চারণ বি...

গ্যাস সংকটে অর্ধেক পোশাকশিল্প, চাই জরুরি সমাধান
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গ্যাস সংকটে অর্ধেক পোশাকশিল্প, চাই জরুরি সমাধান

২ সেপ্টেম্বর বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে বসেছিল বাংলাদেশ প...

চট্টগ্রামের পানিতে জীবাণু, জরুরি নজরদারি প্রয়োজন
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রামের পানিতে জীবাণু, জরুরি নজরদারি প্রয়োজন

পানি জীবনের অপরিহার্য উপাদান। সেই পানির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা মানে জনস্বাস্থ্যের মৌলিক নিরাপত্তা...

জননিরাপত্তা আজ সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় পরীক্ষা
০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জননিরাপত্তা আজ সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় পরীক্ষা

রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব কী? নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ আজ সেই মৌলিক ন...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই