জন্মাষ্টমীর পবিত্র দিনে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের একটি উচ্চারণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ—‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’ তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজেদের ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে নয়, সমান অধিকারভুক্ত নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, ধর্মীয় বা অন্য কোনো বিভাজন নয়, নাগরিকত্বই হবে সবার প্রধান পরিচয়; রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রেও থাকবে না কোনো বৈষম্য। আরো গুরুত্বপূর্ণ, সংবিধানের পাতায় ধর্মীয় স্বাধীনতা লিখে রাখাই যথেষ্ট নয়, তা বাস্তব জীবনেও নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকের মুখ থেকে এমন অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আসল পরীক্ষা বক্তব্যে নয়, আচরণে। কাউকে বারবার বলতে হবে না—‘আপনি সংখ্যালঘু নন’; রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, সিদ্ধান্ত ও আচরণই তাঁকে প্রতিদিন অনুভব করাক—তিনি সত্যিই সমান।
জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানেই বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন, সেগুলো তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সরকারি চাকরি, পদোন্নতি এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সনাতন নাগরিকদের বঞ্চনার অভিযোগ যদি সমাজে তৈরি হয়, তবে সেটিকে রাজনৈতিক বক্তব্য বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আবার প্রমাণিত না হওয়া অভিযোগকে সত্য ধরে নেওয়াও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। সরকারের দায়িত্ব হলো—স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা এবং বৈষম্য প্রমাণিত হলে তার প্রতিকার করা।
কারণ সমঅধিকার কেবল ধর্ম পালনের স্বাধীনতার নাম নয়। একজন নাগরিকের সমঅধিকার মানে চাকরিতে সমান সুযোগ, যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ন্যায়সংগত প্রতিনিধিত্ব, নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসরে মর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণ। কোনো নাগরিকের ধর্মীয় পরিচয় যদি এসব সুযোগের পথে অদৃশ্য কোনো দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে ‘রাষ্ট্র সবার’ কথাটি তার কাঙ্ক্ষিত অর্থ হারায়।
সরকারের আত্মবিশ্লেষণের প্রয়োজন এখানেই। গত দুই বছরে সরকারি চাকরিতে সনাতনদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। টেলিভিশনের আলোচনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরেও সনাতন সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতি কমে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। এগুলো সত্য হলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক; সত্য না হলে সরকারকেই নির্ভরযোগ্য তথ্য দিয়ে জনমনে তৈরি প্রশ্নের অবসান ঘটাতে হবে। রাষ্ট্রের নীরবতা কখনো কখনো অভিযোগের চেয়েও বড় সন্দেহ তৈরি করে।
এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনও রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা রেখে গেছে। দীর্ঘদিন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে দেখার যে ধারণা চালু ছিল, বাস্তবতা তা বদলে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকা অবস্থায়ও বহু সনাতন ভোটার ভোট দিয়েছেন এবং বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির প্রতি তাঁদের উল্লেখযোগ্য সমর্থন দেখা গেছে। নির্বাচনের এই পরিবর্তিত বাস্তবতা স্পষ্ট করে—সনাতন নাগরিক কোনো দলের চিরস্থায়ী ভোটব্যাংক নন; তাঁরা স্বাধীন বিবেক ও রাজনৈতিক পছন্দের অধিকারসম্পন্ন নাগরিক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও পুরোনো ‘ভোটব্যাংক’ ধারণাকে ভ্রান্ত ও কৃত্রিম মিথ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সুতরাং বিএনপি সরকারের দায়িত্ব দ্বিগুণ। তাঁদের প্রতি ন্যায়বিচার কোনো ভোটের প্রতিদান নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। যে নাগরিক বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন, তাঁর অধিকার যেমন সমান, তেমনি যিনি দেননি, তাঁর অধিকারও সমান। রাষ্ট্র কোনো সম্প্রদায়ের অনুগ্রহদাতা নয়—রাষ্ট্র প্রত্যেক নাগরিকের অধিকাররক্ষক।
এ জন্য এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ। সরকারি নিয়োগ ও পদোন্নতিতে ধর্মভিত্তিক বৈষম্যের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা, উপাসনালয় ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা, সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে যোগ্যতার ভিত্তিতে বৈচিত্র্যময় প্রতিনিধিত্ব এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের অভিযোগ তদন্তের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি প্রতিবছর নাগরিক সমঅধিকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্বের একটি স্বচ্ছ প্রতিবেদন প্রকাশ করা যেতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথাটি তাই শুধু জন্মাষ্টমীর মঞ্চের সুন্দর উচ্চারণ হয়ে থাকলে চলবে না। ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ যদি সরকারের মূলনীতি হয়, তার প্রমাণ দিতে হবে নিয়োগে, পদোন্নতিতে, নিরাপত্তায়, প্রশাসনে এবং নাগরিক মর্যাদায়। ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি’ বলার আহ্বানও তখনই অর্থবহ হবে, যখন বৈষম্যের বাস্তব কারণগুলো দূর হবে।
সনাতন নাগরিককে বারবার বলতে হবে না—‘আপনি সংখ্যালঘু নন’। রাষ্ট্রের আচরণই তাঁকে অনুভব করাক—তিনি সত্যিই সমান। এই অনুভূতিই হোক জন্মাষ্টমীর সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। কারণ বাংলাদেশ কারও দয়া বা করুণায় সবার দেশ হবে না; ন্যায়, অধিকার ও সমমর্যাদার নিশ্চয়তাতেই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে সবার হবে।
সানা/আপ্র/৬/৯/২০২৬