২ সেপ্টেম্বর বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে বসেছিল বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির পরিচালনা পর্ষদের প্রতিনিধিদল। সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে ওই সাক্ষাতে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সংকট, রফতানি, বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের। বিজিএমইএর ভাষ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে অধিকাংশ পোশাক কারখানা সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে। গত তিন বছরে উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও রফতানি আদেশের সংকটে বন্ধ হয়েছে প্রায় চারশ কারখানা। একই সময়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন শিল্পখাতের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের রফতানি, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা ও অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোশাক রফতানি কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও কমেছে ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়া নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাটি হলো আন্তর্জাতিক বাজার। নির্ধারিত সময়ে ক্রয়াদেশের পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতা বিকল্প দেশ খুঁজবে। একবার ক্রেতার আস্থা ও বাজার হারালে তা ফিরে পাওয়া কঠিন। অতএব গ্যাস সরবরাহকে নিছক জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখার অবকাশ নেই; এটি জাতীয় রফতানি সক্ষমতা রক্ষার প্রশ্ন।
এ অবস্থায় বিজিএমইএর প্রস্তাবগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার—দ্রুত দুটি নতুন ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনাল স্থাপন, জ্বালানি মূল্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর প্রত্যাহার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে স্বল্পসুদের বিশেষ ঋণ। পাশাপাশি কম সুদে চলতি মূলধন, রফতানি-পরবর্তী অর্থায়ন, সহজ কাস্টমস ব্যবস্থা এবং দ্রুত বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।
তবে এর পাশাপাশি সরকারকে আরেকটি মৌলিক নীতিগত বিষয় নিশ্চিত করতে হবে—শিল্পের বিচার হবে আইনে, রাজনীতির পরিচয়ে নয়। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি বা অপরাধের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু অতীতের রাজনৈতিক অবস্থান, কোনো সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক কিংবা ‘দোসর’ তকমার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান বন্ধ, হয়রানি বা বিনিয়োগের পরিবেশ সংকুচিত করা হলে তার খেসারত শেষ পর্যন্ত দেবে অর্থনীতিই।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হিসাব মেলানোর সময় অর্থনীতির চাকা থামিয়ে দেওয়া যায় না। আজ শিল্পপতির রাজনৈতিক পরিচয় খুঁজে শায়েস্তা করার চেয়ে জরুরি হলো কারখানার চাকা সচল রাখা, শ্রমিকের কর্মসংস্থান রক্ষা, রফতানি বাড়ানো এবং নতুন বিনিয়োগ আনা। সরকারকে তাই প্রতিটি সিদ্ধান্তে আইনের শাসন, ন্যায়সংগত আচরণ ও ব্যবসায়িক আস্থার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য প্রস্তাবিত ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন দ্রুত কার্যকর করা, ঋণের সুদ কমানো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগও সমান জরুরি।
রাষ্ট্রপতি বলেছেন, তৈরি পোশাকশিল্পের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখা জরুরি এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এখন সেই আশ্বাসকে দ্রুত বাস্তব সিদ্ধান্তে রূপ দিতে হবে। কারণ প্রায় অর্ধেক সক্ষমতায় চলা একটি শিল্পকে আর অপেক্ষায় রাখা মানে সংকটকে আরো গভীর করা। দেশের অর্থনীতি আজ বিভাজন নয়, সহযোগিতা চায়; প্রতিহিংসা নয়, উৎপাদন চায়। সবাইকে সঙ্গে নিয়েই শিল্প ও দেশকে এগিয়ে নেওয়ার এখনই সময়।
সানা/আপ্র/৫/৯/২০২৬