জ্বর মানেই সাধারণ জ্বর নয়। আবার জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়ারও কারণ নেই। কিন্তু সেপ্টেম্বরের এই সময়ে জ্বরকে অবহেলা করার সুযোগও নেই।
বর্ষা পেরিয়ে শরতের শুরু—বাতাসে আর্দ্রতা, কোথাও বৃষ্টির পানি জমে থাকা, মশার বংশবিস্তার এবং বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণ; সব মিলিয়ে একই সময়ে একাধিক রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ডেঙ্গু বাড়ছে, হাম এখনো উদ্বেগের কারণ, পাশাপাশি বিভিন্ন ভাইরাসজনিত জ্বর ও চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণও দেখা যাচ্ছে। ফলে কারও জ্বর হলে ‘সাধারণ জ্বর’ ধরে নিয়ে কয়েক দিন অপেক্ষা করা কখনো কখনো বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা এ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হয়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম কয়েক দিনেও প্রতিদিন এক হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
প্রথম কাজ—জ্বরের হিসাব রাখুন: জ্বর কখন শুরু হয়েছে, সর্বোচ্চ কত উঠেছে, সঙ্গে কী কী উপসর্গ রয়েছে—এসব লিখে রাখুন। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই ধরনের জ্বরের পেছনে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, হাম কিংবা অন্য কোনো ভাইরাসজনিত সংক্রমণ থাকতে পারে; শুধু উপসর্গ দেখে সব সময় নিশ্চিত হওয়া যায় না।
জ্বরের সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও পেশিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব বা চামড়ায় ফুসকুড়ি থাকলে ডেঙ্গুর কথা বিবেচনা করতে হবে। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। রোগের প্রথম সাত দিনে এনএস১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা কার্যকর হতে পারে; রোগের সময় ও উপসর্গ অনুযায়ী অন্যান্য পরীক্ষাও প্রয়োজন হতে পারে। তবে একটি কথা মনে রাখা জরুরি—শুধু অণুচক্রিকার সংখ্যা দেখেই ডেঙ্গুর তীব্রতা বিচার করা যায় না; রোগীর সামগ্রিক অবস্থা, রক্তচাপ, রক্তের ঘনত্ব ও প্রস্রাবের পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা চলমান পরিস্থিতিতে এক থেকে দুই দিনের জ্বরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ডেঙ্গু পরীক্ষা বিবেচনার কথা বলেছেন। তাই জ্বরকে কয়েক দিন ‘দেখি কী হয়’ বলে ফেলে রাখা ঠিক নয়।
বাড়িতে প্রাথমিক যত্ন কীভাবে: জ্বর হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম সবচেয়ে জরুরি। বারবার অল্প অল্প করে পানি, খাবার স্যালাইন, স্যুপ, ডাবের পানি বা অন্যান্য সহনীয় তরল পান করতে হবে। স্বাভাবিক খাবার খেতে পারলে খাবেন; শুধু জ্বর হয়েছে বলে না খেয়ে থাকা ঠিক নয়।
জ্বর ও শরীরের ব্যথায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যায়। কিন্তু ডেঙ্গুর সম্ভাবনা বাদ না দেওয়া পর্যন্ত নিজের ইচ্ছায় অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেনসহ প্রদাহনাশক ব্যথার ওষুধ খাবেন না। ডেঙ্গু থাকলে এসব ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেঙ্গু বাদ না দেওয়া পর্যন্ত এসব ওষুধ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
আরেকটি বড় ভুল—চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও অধিকাংশ ভাইরাসজনিত জ্বরে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো উপকার করে না।
গিঁটে গিঁটে ব্যথা হলে চিকুনগুনিয়া? হঠাৎ উচ্চ জ্বরের সঙ্গে তীব্র গিঁটের ব্যথা, পেশিতে ব্যথা, মাথাব্যথা, দুর্বলতা বা চামড়ায় ফুসকুড়ি থাকলে চিকুনগুনিয়ার কথাও মাথায় রাখতে হবে। এই রোগের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক ওষুধ নেই; চিকিৎসা মূলত জ্বর ও ব্যথা কমানো, পর্যাপ্ত তরল পান এবং বিশ্রামনির্ভর। অধিকাংশ মানুষ এক সপ্তাহের মধ্যে ভালো বোধ করলেও গিঁটের ব্যথা অনেকের ক্ষেত্রে সপ্তাহ বা মাস ধরে থাকতে পারে।
চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু একই ধরনের মশার মাধ্যমে ছড়াতে পারে এবং উপসর্গেও মিল রয়েছে। তাই শুধু ‘গিঁটে ব্যথা হয়েছে’ বলে নিশ্চিতভাবে চিকুনগুনিয়া ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
শিশুর জ্বর হলে আরো সতর্কতা: শিশুর জ্বরকে কখনো অবহেলা করা যাবে না। বিশেষ করে জ্বরের সঙ্গে কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং পরে সারা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে হাম বিবেচনায় নিতে হবে। শিশুর টিকাদান সম্পূর্ণ হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
হাম সন্দেহ হলে শিশুকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে আলাদা রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ হাম অত্যন্ত সংক্রামক এবং অপুষ্ট শিশু বা দুর্বল রোগপ্রতিরোধক্ষমতার শিশুর ক্ষেত্রে জটিলতা গুরুতর হতে পারে।
এই লক্ষণ দেখলে অপেক্ষা নয়: জ্বরের সঙ্গে নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে—
তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, বমি বা পায়খানায় রক্ত, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা অস্থিরতা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার প্রবণতা এবং প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পর রোগী আরো দুর্বল হয়ে পড়লে বিপদসংকেত হিসেবে দেখতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি কথা: এই সময়ের জ্বরকে ভয় নয়, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। জ্বর হলে প্রথমে রোগীকে পর্যাপ্ত তরল ও বিশ্রাম দিতে হবে, জ্বরের দিনের হিসাব রাখতে হবে, বিপদসংকেত নজরে রাখতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করতে হবে।
একই সঙ্গে বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা কিংবা যে কোনো জলাধার পরিষ্কার করতে হবে। কারণ ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার চিকিৎসার পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর পথ। খুলনাতেও ডেঙ্গু বাড়তে থাকায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বাড়িঘর ও আশপাশের জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
মনে রাখুন—জ্বর নিজে কোনো রোগের নাম নয়; এটি শরীরের একটি সতর্কসংকেত। সেপ্টেম্বরের এই সংক্রমণপ্রবণ সময়ে সেই সংকেতকে অবহেলা না করাই হতে পারে বড় বিপদ এড়ানোর প্রথম পদক্ষেপ।
সানা/আপ্র/৫/৯/২০২৬