বাংলাদেশের রাজনীতি আবারো এমন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার চেয়ে পরস্পরকে বোঝা, মতভেদকে সহিষ্ণুতার সঙ্গে ধারণ করা এবং জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য খুঁজে নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত, অবিশ্বাস, প্রতিহিংসা ও রক্তপাতের অভিজ্ঞতার পর দেশের মানুষ নিশ্চয়ই আর সেই পুরোনো বিভাজন ও সংঘর্ষের রাজনীতিতে ফিরে যেতে চায় না। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিজ জেলা ঠাকুরগাঁও সফরে দেওয়া ‘কোনো হানাহানি নয়, কোনো সংঘর্ষ নয়—আলোচনার মধ্য দিয়ে রাজনীতি করব’—এই আহ্বান তাই শুধু একটি জেলার জন্য নয়, সমগ্র দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য মতের মিলনে নয়, বরং মতের অমিলকে শান্তিপূর্ণভাবে ধারণ করার সক্ষমতায়। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, সংসদে বিতর্ক থাকবে, সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা থাকবে, বিরোধী দলের প্রতিবাদও থাকবে—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চিত্র। কিন্তু মতপার্থক্য যখন বিদ্বেষে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন শত্রুতায় এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি যখন সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় কেবল একটি দল নয়; দুর্বল হয় রাষ্ট্র, বিপন্ন হয় নাগরিকের নিরাপত্তা এবং প্রশ্নের মুখে পড়ে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।
এ কারণেই রাষ্ট্রপতির সমঝোতার আহ্বানকে রাজনৈতিক সৌজন্যের সাধারণ বক্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক নীতির সঙ্গে যুক্ত। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা। ক্ষমতায় থাকা দলকে বিরোধী মতের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, আর বিরোধী শক্তিকেও সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক পথের প্রতি আস্থা রাখতে হবে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে হতে হবে দলীয় প্রভাবমুক্ত, আইনের প্রয়োগ হতে হবে ন্যায়সংগত ও সমান; তাহলেই রাজনৈতিক আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা আমাদের আরো একটি শিক্ষা দিয়েছে—শুধু রাজনৈতিক সমঝোতা যথেষ্ট নয়, সামাজিক ঐক্যও অপরিহার্য। ধর্ম, সম্প্রদায়, অঞ্চল কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজন উসকে দিয়ে কোনো স্থায়ী জাতীয় অগ্রগতি সম্ভব নয়। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ সব নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করাই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। জাতীয় ঐক্য কোনো স্লোগান নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নীতি ও রাজনৈতিক আচরণে প্রতিফলিত হতে হয়।
একই সঙ্গে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে হবে মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, কৃষি, শিল্প, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং মাদকমুক্ত সমাজ—এসবই এখন মানুষের অগ্রাধিকারের বিষয়। তরুণদের সামনে সম্ভাবনার দরজা খুলতে না পারলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
তাই আজ প্রয়োজন প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংলাপ, অবিশ্বাসের পরিবর্তে আস্থা এবং বিভেদের পরিবর্তে জাতীয় ঐক্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। রাষ্ট্রপতির আহ্বানকে বাস্তব রূপ দিতে হলে সব রাজনৈতিক দলকেই নিজেদের আচরণে তার প্রমাণ দিতে হবে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে এ ক্ষেত্রে হতে হবে ন্যায়, সহিষ্ণুতা ও সমঝোতার নির্ভরযোগ্য অভিভাবক।
বাংলাদেশ অনেক রক্তের বিনিময়ে গণতন্ত্রের পথ নির্মাণ করেছে। সেই পথ আর রক্তে রঞ্জিত নয়—আলোচনা, সহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও জাতীয় ঐকমত্যের মধ্য দিয়েই সামনে এগিয়ে যাক দেশ। এটাই হোক আজকের সবচেয়ে জরুরি রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
সানা/আপ্র/৮/৯/২০২৬