জীবিকার তাগিদে একসময় গাড়ির স্টিয়ারিং ধরতেন মিজানুর রহমান। তবে নিজের কিছু করার স্বপ্ন ছিল তার। সেই স্বপ্ন থেকেই ২০২১ সালে শুরু করেন মিশ্র ফলের চাষ। নানা সীমাবদ্ধতা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি পেরিয়ে এখন আড়াই বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন তিনটি ফলের বাগান। ফল উৎপাদনের পাশাপাশি উন্নত জাতের চারা উৎপাদন ও বিক্রি করেও আয় করছেন তিনি।
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নের ছোট কলধারী গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান পেশায় গাড়িচালক। গাড়ি চালানোর পাশাপাশি কৃষিকাজকে নিজের বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে গড়ে তুলেছেন তিনি।
বাগানে দেশি-বিদেশি নানা ফল
মিজানুরের বাগানে রয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের ফল। এর মধ্যে ভিয়েতনামি মাল্টা, ১২ মাসি মাল্টা, মাল্টা পয়সা, বারি-১, বাউ-৩ ভিয়েতনামি জাত, চায়না ও দার্জিলিং কমলা, বেদানা বারি-৪ ও বারি-৭, পেঁপে এবং বিভিন্ন জাতের লেবু উল্লেখযোগ্য।
ইতোমধ্যে বাগানের বেশ কিছু গাছে ফল ধরেছে। সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলছে মাল্টা, কমলা, বেদানা ও অন্যান্য ফল। উৎপাদিত ফল স্থানীয় বাজার, বিভিন্ন হাট-বাজার ও বড় মোকামে বিক্রি করছেন মিজানুর। এতে স্থানীয়ভাবে তার বাগানের ফলের চাহিদাও তৈরি হয়েছে।
ফলের পাশাপাশি চারা বিক্রি
শুধু ফল উৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকেননি মিজানুর। বিভিন্ন উন্নত জাতের ফলের চারা উৎপাদন ও বিক্রিও করছেন। এতে তার আয় বাড়ার পাশাপাশি আশপাশের কৃষকরাও উন্নত জাতের চারা সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছেন।
মিজানুর রহমান বলেন, মানুষের ফলের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নিজের জীবিকা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই ফলের বাগান করার উদ্যোগ নিয়েছেন। শুরুতে নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল। নতুন জাতের ফল সম্পর্কে জানতে হয়েছে এবং গাছের পরিচর্যা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়েছে। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে বাগান বড় করেছেন।
তিনি বলেন, “নিজের উদ্যোগে কিছু করার ইচ্ছা থেকেই ফলের বাগান শুরু করি। এখন বাগানে বিভিন্ন জাতের ফল হচ্ছে। ফলের পাশাপাশি উন্নত জাতের চারাও বিক্রি করছি। মানুষের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বাগান করার ইচ্ছা রয়েছে।”
আগ্রহ বাড়ছে স্থানীয় কৃষকদের
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পেশায় গাড়িচালক হয়েও অবসর সময়ে মিজানুরের কৃষিকাজে যুক্ত হওয়া এবং নিজের শ্রমে ফলের বাগান গড়ে তোলা এলাকায় আগ্রহ তৈরি করেছে। তার কাছ থেকে অনেকে ফলের চারা সংগ্রহ করছেন এবং নতুন করে বাগান করার ব্যাপারেও আগ্রহী হচ্ছেন।
স্থানীয় কৃষক করিম বলেন, আগে তারা মনে করতেন ভালো ফলন পেতে বড় জমি ও অনেক অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু মিজানুরের বাগান দেখে বোঝা যাচ্ছে, পরিকল্পনা করে বিভিন্ন জাতের ফল চাষ করেও ভালো কিছু করা সম্ভব।
মহম্মদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইশরাত জাহান শিলু বলেন, মিজানুর রহমানের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। গাড়িচালক হয়েও তিনি মিশ্র ফলের বাগান করে এলাকায় সাড়া ফেলেছেন এবং কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। এ ধরনের উদ্যোগ অন্যদেরও কৃষির প্রতি আগ্রহী করবে।
তিনি বলেন, কৃষিতে এমন উদ্যোগ বাড়লে স্থানীয়ভাবে ফলের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও ফলের বাগান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিকল্পনা ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে মিজানুরের মতো উদ্যোক্তারা আরও এগিয়ে যেতে পারেন।
একসময় জীবিকার প্রয়োজনে যে হাতে ছিল গাড়ির স্টিয়ারিং, এখন সেই হাতেই নানা জাতের ফলগাছের পরিচর্যা করছেন মিজানুর। তার এই উদ্যোগ দেখাচ্ছে, প্রচলিত পেশার পাশাপাশি পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও ধৈর্য থাকলে কৃষিকেও আয়ের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
এসি/আপ্র/০৮/০৯/২০২৬