বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারির জন্য শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ৬৩তম অধিবেশনে বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া বক্তৃতায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এসব কথা বলেন ফলকার টুর্ক।
তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজের ওপর নজরদারি করতে পারে, এমন একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে আসছি।’
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ডের বিষয়ে স্বাধীন নজরদারি নিশ্চিত করতে আরো শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা এর আগেও একাধিকবার বলেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার। এসব সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়ে আসছেন তিনি।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বিক্ষোভের সময় সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি তথ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে ওই প্রতিবেদনে ৪৪টি সুপারিশ করা হয়।
সুপারিশগুলোর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ড তদারকিতে স্বাধীন নজরদারি প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বেসামরিক নজরদারি এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশও ছিল সেখানে।
জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন তদারকিতে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত বিভিন্ন চুক্তি সংস্থার সুপারিশও তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের থাকা প্রয়োজন।
এ ছাড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছিল। কমিশনের সদস্য নিয়োগে প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও যোগ্যতাভিত্তিক প্রক্রিয়া চালুর সুপারিশ করা হয়।
এদিকে বাংলাদেশে সম্প্রতি প্রণীত গুমবিরোধী আইন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত আইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড পুরোপুরি পূরণ করছে না বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার সংগঠন ও আইনবিশেষজ্ঞরা।
তাঁদের মতে, এসব আইনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, তদন্তের ক্ষমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।
ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ডে স্বাধীন নজরদারি, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আরো শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তাই আবার সামনে আনলেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার।
সানা/আপ্র/৮/৯/২০২৬