গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

গাজায় শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিতে অনাহারে বড়রা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০০:৩৫ পিএম, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ০২:০৬ এএম ২০২৬
গাজায় শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিতে অনাহারে বড়রা
ছবি

পরিবারের সঙ্গে মেরভাত রাদওয়ান -ছবি আল জাজিরা

গাজায় খাবারের সংকট এখন শুধু একবেলা খাবার জোগাড়ের লড়াই নয়; অনেক পরিবারের কাছে এটি হয়ে উঠেছে শিশুদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার বিনিময়ে নিজেদের অনাহারে থাকার নির্মম বাস্তবতা। কমিউনিটি রান্নাঘরের খাবার কমে যাওয়া, বাজারে খাদ্যের উচ্চমূল্য এবং অনিয়মিত ত্রাণ সহায়তায় পরিবারগুলোকে প্রতিদিনই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে—কার মুখে খাবার যাবে, আর কে না খেয়ে থাকবে।

বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের একটি শিবিরে থাকেন ৪৫ বছর বয়সী মেরভাত রাদওয়ান। যেদিন কমিউনিটি রান্নাঘর থেকে দুপুরের খাবার দেওয়া হয়, সেদিন কিছুটা স্বস্তি পান তিনি। হাঁড়ি হাতে ছোট ভাগনে উবাইকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে যান রান্নাঘরের দিকে। কিন্তু সাত সদস্যের পরিবারের জন্য রান্নাঘর থেকে পাওয়া খাবার কখনোই যথেষ্ট হয় না। তাই ত্রাণের প্যাকেট থেকে পাওয়া টুনা মাছ, শিম বা মটরশুঁটির মতো যা কিছু থাকে, তা মিশিয়ে খাবারের পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি।

রাদওয়ান বলেন, কখনো রান্না করা খাবার পাওয়া গেলেও সাতজনের জন্য তা যথেষ্ট হয় না। তাই অন্য কিছু জোগাড় করে খাবারটা বাড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি।

গাজার স্বল্প বা কোনো আয় নেই—এমন পরিবারগুলোর অন্যতম প্রধান ভরসা এখন কমিউনিটি রান্নাঘর। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এসব রান্নাঘরের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রাদওয়ানের বাস্তুচ্যুত শিবিরের কাছের রান্নাঘরটিও প্রায় দুই মাস বন্ধ ছিল। পরে আবার চালু হলেও সপ্তাহে মাত্র দুই দিন খাবার দিচ্ছে।

জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের মাঝামাঝি গাজায় ১৬৫টি কমিউনিটি রান্নাঘর থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ খাবার সরবরাহ করা হতো। জুলাইয়ে রান্নাঘরের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১০২টিতে। প্রতিদিন খাবার সরবরাহও নেমে আসে প্রায় ছয় লাখ ৯৮ হাজারে। অর্থের তীব্র সংকট ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দাতব্য সংস্থাগুলো খাবার ও রান্নার প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহেও সমস্যায় পড়ছে।

বাবা-মাকে হারিয়ে তিন শিশুর দায়িত্ব: রাদওয়ানের কাঁধে এখন নিজের তিন ভাগনে-ভাগনির দায়িত্বও। ২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর উত্তর গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন তাঁর ৩৮ বছর বয়সী ভাই মোহাম্মদ ও তাঁর ৩৩ বছর বয়সী স্ত্রী আনোয়ার। ওই হামলায় তাঁদের এক বছর বয়সী ছেলে ইউসুফও নিহত হয়।

তবে তাঁদের আরো তিন সন্তান বেঁচে যায়। ১৪ বছর বয়সী নাইফের মাথায় ধাতব টুকরা ঢুকে যায়। ১১ বছর বয়সী হাবিব শরীরের বিভিন্ন স্থানে পুড়ে যায়। আর উবাইও গুরুতরভাবে দগ্ধ হয়।

গত নয় মাস ধরে তারা দেইর আল-বালাহর একটি তাঁবুতে বসবাস করছে। তাদের সঙ্গে রয়েছেন রাদওয়ানের ৭০ বছর বয়সী বাবা এবং ৪০ বছর বয়সী বোন সানা। পরিবারের কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যেরই নিয়মিত আয়ের উৎস নেই। ফলে একদিন থেকে আরেকদিন বেঁচে থাকতে তাঁদের নির্ভর করতে হচ্ছে ত্রাণ ও দাতব্য সহায়তার ওপর।

বাবা-মাকে হারানোর মানসিক ক্ষতের সঙ্গে শিশুদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে খাবার, পানি ও চিকিৎসাসহ মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর সংকটেরও। রাদওয়ানের ভাষায়, শিশুদের দায়িত্ব নেওয়া শুধু তাদের ঘরে তুলে নেওয়া নয়; এর সঙ্গে খাবার, পানীয়, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর দায়িত্বও রয়েছে।

খাবারের সংকট দেখা দিলে পরিবারের বড়রাই নিজেদের খাবার কমিয়ে দেন, যাতে শিশুরা অন্তত পেট ভরে খেতে পারে। রাদওয়ান জানান, তাঁর বৃদ্ধ বাবা নাতি-নাতনিরা যথেষ্ট খেয়েছে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নিজে খাবার খান না।

মাংস বিলাসিতা, সবজিও নাগালের বাইরে: এই পরিবারের কাছে মাংস এখন প্রায় বিলাসিতার মতো। তাজা সবজিও পাওয়া কঠিন। সরবরাহ কম, তার ওপর দাম বেশি। গাজার কিছু সংগঠন মাঝেমধ্যে সবজি বিতরণ করলেও সেই সহায়তা নিয়মিত নয়।

১১ বছর বয়সী হাবিবের সুস্থতার জন্য পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন। চিকিৎসক তাঁকে ঘন ঘন পানি পান করার পাশাপাশি শসার মতো পানিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু এক কেজি শসার দাম প্রায় ১৫ শেকেল। টমেটোর দাম ১০ থেকে ১২ শেকেল পর্যন্ত। এই দামও পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে।

রাদওয়ান বলেন, উবাই কিংবা অন্য শিশুরা শসা চাইলে তিনি মাত্র তিনটি শসা কিনতে পারেন।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, জুলাইয়ে গাজার বাজারে খাবার পাওয়া গেলেও উচ্চমূল্যের কারণে অনেক পরিবার তাজা সবজি, ফল ও আমিষসমৃদ্ধ খাবার সংগ্রহ করতে পারেনি। প্রায় ৭৭ শতাংশ পরিবার এ ধরনের খাবার জোগাড়ে সমস্যার কথা জানিয়েছে।

টিনজাত খাবারে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি: বাজারে খাবার থাকলেও তা কেনার সামর্থ্য নেই বহু পরিবারের। ফলে ত্রাণের প্যাকেটের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর খাদ্যতালিকায় টিনজাত খাবারের আধিপত্য বাড়ছে। এতে পেট ভরলেও প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত হচ্ছে না।

রাদওয়ানের পরিবারও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রায় এক বছর ধরে কিডনিতে পাথরের সমস্যায় ভুগছে হাবিব। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার এবং প্রায় পুরোপুরি টিনজাত খাবারের ওপর নির্ভরশীলতার সঙ্গে তাঁর এই সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু তাজা খাবারের দাম বেশি হওয়ায় হাবিবের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা পরিবারের জন্য কঠিন।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সাম্প্রতিক তথ্যও গাজার খাদ্যনিরাপত্তার গভীর সংকটের চিত্র তুলে ধরছে। সংস্থাটির হিসাবে, গাজায় প্রায় ১৪ লাখ মানুষ এখনো তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার সংকট বা তার চেয়েও খারাপ অবস্থায় রয়েছে। প্রতি মাসে প্রায় ১৫ লাখ মানুষকে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হলেও এই সহায়তা অব্যাহত না থাকলে বছরের শেষ নাগাদ পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

গাজার পরিবারগুলোর জন্য ত্রাণ ও দাতব্য সংস্থার খাবার সহায়তা তাই একেকটি দিন পার করার অবলম্বন। কিন্তু শুধু পেট ভরানোই যে যথেষ্ট নয়, রাদওয়ানের পরিবারের অভিজ্ঞতা তার নির্মম প্রমাণ। শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিতে গিয়ে বড়দের অনাহারে থাকা, পুষ্টির অভাবে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়া এবং উচ্চমূল্যের কারণে তাজা খাবার থেকে দূরে সরে যাওয়া—সব মিলিয়ে গাজার খাদ্যসংকট এখন ক্ষুধার পাশাপাশি একটি গভীর পুষ্টি ও মানবিক সংকটেও রূপ নিয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা 
সানা/আপ্র/৮/৯/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

বাংলাদেশে পাঁচ বছরে ৬৩৬ কোটি ডলার বিনিয়োগের উদ্যোগ জাপানের
২৩ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশে পাঁচ বছরে ৬৩৬ কোটি ডলার বিনিয়োগের উদ্যোগ জাপানের

বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে আগামী পাঁচ বছরে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬৩৬ কোটি ডলারের বিনিয়োগের ব্যবস্থা করে দ...

ফ্রান্সের অস্থিরতা নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যকে নির্বোধ বললেন মাক্রোঁ
২২ অক্টোবর ২০২৬

ফ্রান্সের অস্থিরতা নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যকে নির্বোধ বললেন মাক্রোঁ

ফ্রান্সের শহরগুলোতে চলমান অস্থিরতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিদেশি নেতারা র...

‘অসুরেরা থেমে নেই’, নিউ ইয়র্কে দুর্গোৎসবে বললেন মামদানি
২২ অক্টোবর ২০২৬

‘অসুরেরা থেমে নেই’, নিউ ইয়র্কে দুর্গোৎসবে বললেন মামদানি

যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক বন্ধন ভেঙে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেছেন নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়...

সৌদি আরবের বিমানবন্দরে ফের হামলায় নিহত ১
২২ অক্টোবর ২০২৬

সৌদি আরবের বিমানবন্দরে ফের হামলায় নিহত ১

সৌদি আরবের দাম্মাম শহরের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় একজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পতিত স্বৈরাচার ও বিরোধী দল বিশৃঙ্খলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত: প্রধানমন্ত্রী

দেশের বিভিন্ন স্থানে ও কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির পেছনে পলাতক স্বৈরাচার ও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ বিষয়ে তাঁর কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে দাবি করে তিনি বলেছেন, এক পক্ষ সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করছে, অন্য পক্ষ দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে