মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থান ও জলসীমার নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হুমকিও ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। নিউ মেক্সিকোর নাম ‘নিউ আমেরিকা’ করার প্রস্তাব থেকে শুরু করে হরমুজ প্রণালি ও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় ট্রাম্প।
গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একাধিক পোস্টে নিউ মেক্সিকোর নাম বদলে ‘নিউ আমেরিকা’ রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, অনেকেই তাঁকে অঙ্গরাজ্যটির নাম পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন এবং নতুন নামটি আরো মর্যাদাপূর্ণ ও সুন্দর হবে। পরে হোয়াইট হাউসও তাঁর পোস্টের একটি ছবি পুনঃপ্রচার করে, যেখানে ‘নিউ মেক্সিকো’ নামের ‘মেক্সিকো’ অংশের বদলে ‘আমেরিকা’ লেখা দেখা যায়।
তবে এ নিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—নিউ মেক্সিকোর নাম পরিবর্তনের কোনো নির্বাহী আদেশ ট্রাম্প এখনো দেননি। এটি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি প্রস্তাব মাত্র। অঙ্গরাজ্যটির আনুষ্ঠানিক নাম পরিবর্তনের কোনো আইনগত প্রক্রিয়াও শুরু হয়নি। গভর্নর মিশেল লুহান গ্রিশাম সরাসরি এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, নিউ মেক্সিকোর নাম পরিবর্তনের কোনো প্রশ্নই নেই।
অন্যদিকে, লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ট্রাম্প নির্বাহী আদেশ দিয়েছেন। গত ২৭ আগস্ট সই করা ওই আদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যবহারের জন্য লেক অন্টারিওর নতুন নাম ‘লেক আমেরিকা’ নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আগে ২০২৫ সালে মেক্সিকো উপসাগরের নাম ‘আমেরিকা উপসাগর’ করার উদ্যোগও নিয়েছিলেন তিনি। এসব নাম পরিবর্তন নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশ ও পক্ষগুলোর আপত্তি রয়েছে।
নাম পরিবর্তনের এমন উদ্যোগের পাশাপাশি ইরানকে ঘিরে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থান আরো উদ্বেগজনক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি কয়েকটি ছবি প্রকাশ করে তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। একটি ছবিতে ইরানের মানচিত্রের ওপর তাঁর মুখের অবয়ব বসানো হয়েছে। আরেকটিতে যুদ্ধবিমানকে তেলকূপে হামলা চালাতে দেখা যায়। ছবিটির সঙ্গে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘বিদায়, খার্গ’।
ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্রগুলোর একটি খার্গ দ্বীপ। ফলে দ্বীপটিকে ঘিরে ট্রাম্পের হুমকি তেহরানের তেল রপ্তানি অবকাঠামোর ওপর সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা আরো বাড়িয়েছে। তাঁর পোস্টগুলোতে ইরানের তেল রপ্তানি কমে যাওয়া, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, প্রণালিটি দিয়ে তেল পরিবহন যুদ্ধের আগের অবস্থার কাছাকাছি ফিরেছে। তবে ইরানের বক্তব্য ভিন্ন। তেহরান বলছে, প্রণালিটির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং অনুমোদনহীনভাবে চলাচলকারী জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
ইরানের কঠোর পাল্টা হুঁশিয়ারি: ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ বলেছেন, ‘সমানুপাতিক জবাবের যুগ শেষ হয়ে গেছে’। ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো নতুন আগ্রাসনের জবাব আরো দ্রুত, তীব্র ও বেদনাদায়ক হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি অবকাঠামোও ইরানের পাল্টা হামলার আওতায় আসতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
এরই মধ্যে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসেন রেজাই জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালির বাইরে একটি নতুন ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ ঘোষণা করা হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই এলাকা যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের সীমারেখা থেকে পারস্য উপসাগরের কিছু অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। সেখানে প্রবেশকারী যেকোনো জাহাজকে ইরানের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রাখা হবে।
রেজাই আরো জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে নতুন একটি নৌপথ চালুর বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত নিষিদ্ধ এলাকার সুনির্দিষ্ট সীমানা ও তা কার্যকরের বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগে হরমুজ প্রণালির নাম ‘ট্রাম্প প্রণালি’ করার ধারণা নিয়েও মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প। পরে অবশ্য তিনি বিষয়টিকে খুব গুরুতর নয় বলে ইঙ্গিত দেন।
নিউ মেক্সিকোর নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব এখনো রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকলেও ইরানকে ঘিরে ট্রাম্পের হুমকি বাস্তব সামরিক উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত। খার্গ দ্বীপ, হরমুজ প্রণালি এবং পারস্য উপসাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি হুমকি অব্যাহত থাকায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত আরো বিপজ্জনক মোড় নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সানা/আপ্র/৮/৯/২০২৬