প্রতিদিনের রান্নায় যে উপাদানটি প্রায় অদৃশ্যভাবে মিশে থাকে, তার গুরুত্ব আমরা অনেক সময়ই আলাদা করে ভাবি না। পেঁয়াজ তেমনই এক পরিচিত উপাদান। রান্নার শুরুতে তেলে ভাজার সময় থেকে শুরু করে সালাদের শেষ সাজ—বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে পেঁয়াজের উপস্থিতি যেন অবিচ্ছেদ্য। অথচ স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়ানোর এই সাধারণ সবজিটির ভেতরেই রয়েছে খাদ্যতন্তু, অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট, ভিটামিন, খনিজ এবং নানা উদ্ভিজ্জ যৌগ। এর মধ্যে কোয়ারসেটিন ও সালফারযুক্ত যৌগ বিশেষভাবে আলোচিত।
হৃদ্রোগসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্ব দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। সেই খাদ্যতালিকায় নিয়মিত ও পরিমিত পেঁয়াজ কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়েও গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষণায় কোলেস্টেরল, রক্তচাপ ও হৃদ্স্বাস্থ্যের সঙ্গে পেঁয়াজের সম্ভাব্য ইতিবাচক সম্পর্কের ইঙ্গিত মিলেছে। তবে এটিকে কোনো রোগের ওষুধ বা একক প্রতিরোধক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবেই পেঁয়াজের পুষ্টিগুণকে বিবেচনা করা উচিত।
অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টের ভালো উৎস: পেঁয়াজে থাকা কোয়ারসেটিন একটি ফ্ল্যাভোনয়েড, যা অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হিসেবে কাজ করে। শরীরে অক্সিডেটিভ চাপের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোয়ারসেটিনের প্রদাহ-সম্পর্কিত বিভিন্ন সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও গবেষণা হয়েছে।
হজমতন্ত্রের জন্য উপকারী খাদ্যতন্তু: পেঁয়াজে খাদ্যতন্তু রয়েছে, যা প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় আঁশ যোগ করতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত খাদ্যতন্তু মলত্যাগ স্বাভাবিক রাখা এবং হজমতন্ত্রের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া পেঁয়াজে থাকা কিছু প্রিবায়োটিক উপাদান অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর খাদ্য হিসেবেও কাজ করতে পারে। তবে সবার শরীর একভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না। বিশেষ করে কাঁচা পেঁয়াজ খেলে কারও কারও গ্যাস, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হতে পারে। তাই ব্যক্তিগত সহনশীলতা অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।
কোলেস্টেরল কমাতে কতটা ভূমিকা? পেঁয়াজের সালফারযুক্ত যৌগ ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ উপাদান হৃদ্স্বাস্থ্যের সম্ভাব্য উপকারের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষণায় পেঁয়াজ বা এর নির্যাস গ্রহণের সঙ্গে রক্তের চর্বি ও কোলেস্টেরলের কিছু পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে শুধু পেঁয়াজ খেলেই কোলেস্টেরল কমে যাবে। উচ্চ কোলেস্টেরল থাকলে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ গ্রহণ—সবকিছুর গুরুত্ব রয়েছে।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও সম্ভাবনার ইঙ্গিত: পেঁয়াজে থাকা কোয়ারসেটিনসহ কিছু উদ্ভিজ্জ যৌগ রক্তনালির কার্যক্রম ও রক্তচাপের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা নিয়েও গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষণায় ইতিবাচক প্রভাবের সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও পেঁয়াজকে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ, লবণ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, শরীরচর্চা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়াই প্রধান করণীয়।
কম ক্যালরিতে বাড়তি পুষ্টি: পেঁয়াজে পানির পরিমাণ বেশি এবং ক্যালরি তুলনামূলক কম। এতে ভিটামিন সি, ভিটামিন বি৬, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানও পাওয়া যায়। ফলে অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত উপকরণের পরিবর্তে খাবারের স্বাদ বাড়াতে পরিমিত পেঁয়াজ ব্যবহার করা যেতে পারে।
কাঁচা, নাকি রান্না করে? পেঁয়াজ কাঁচা কিংবা রান্না—দুইভাবেই খাওয়া যায়। কাঁচা পেঁয়াজে তাপ-সংবেদনশীল কিছু উপাদান তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে বজায় থাকতে পারে। অন্যদিকে রান্নার সময় তাপের কারণে কিছু যৌগের পরিমাণ কমে যেতে পারে। তবে পেঁয়াজ কাঁচাই খেতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। সালাদে কাঁচা পেঁয়াজ অথবা রান্নায় পরিমিত পেঁয়াজ—দুইভাবেই এটি খাদ্যতালিকায় রাখা সম্ভব।
সবশেষে মনে রাখা জরুরি, কোনো একটি খাবার একাই হৃদ্রোগের ঝুঁকি দূর করতে পারে না। হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে প্রয়োজন সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। শাকসবজি, ফল, পূর্ণশস্য, ডাল ও পর্যাপ্ত প্রোটিনের পাশাপাশি পরিমিত পেঁয়াজ খাদ্যতালিকায় যুক্ত হতে পারে। নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সঙ্গে এই খাদ্যাভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য বেশি কার্যকর।
সানা/আপ্র/৮/৯/২০২৬