চট্টগ্রামে এক চিকিৎসকের কাছে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসীর পরিচয়ে প্রথমে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, নির্ধারিত সময়ে টাকা না পেয়ে সেই অঙ্ক দ্বিগুণ করে ২০ লাখ টাকা দাবি এবং ১০০ জন পুলিশ থাকলেও গুলি করে হত্যার হুমকি—ঘটনাটি নিছক একটি চাঁদাবাজির অভিযোগ নয়; এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি ভয়ংকর ঔদ্ধত্যের বহিঃপ্রকাশ। আরো উদ্বেগের বিষয়, রোগী সেজে চিকিৎসকের চেম্বারে ঢুকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ অপরাধীরা শুধু অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেনি, একজন চিকিৎসকের পেশাগত পরিসর ও তাঁর কাছে আসা রোগীদের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
ঘটনার পর নগরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে আটক এবং তাঁদের কাছ থেকে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য অবশ্যই স্বস্তিদায়ক। পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিরা বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর কাছে বড় সাজ্জাদ, রায়হানসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসীর পরিচয়ে চাঁদা দাবি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছিলেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁদের কেউ কেউ নির্দেশে, আবার কেউ কখনো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অগোচরেও তাঁদের পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদা দাবি করার কথা বলেছেন। এই তথ্য অপরাধের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন মাত্রা সামনে আনে—পরিচিত সন্ত্রাসীর নাম এখন অপরাধীদের কাছে যেন একটি ভয় সৃষ্টির হাতিয়ার।
এখানেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে বড় প্রশ্ন। একজন অপরাধী বিদেশে পালিয়ে থাকলেও তাঁর নাম, পরিচয় ও নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে দেশে বসে অপরাধ চালানোর সুযোগ কীভাবে তৈরি হচ্ছে? কারাগারে থাকা কোনো সহযোগীর যোগাযোগ ও প্রভাব যদি বাইরে চাঁদাবাজি পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়, তবে কারাগার ব্যবস্থাপনা, মোবাইল যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধীদের আর্থিক নেটওয়ার্ক—সবকিছুকেই নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি।
বিশেষত চিকিৎসকদের মতো পেশাজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। একজন চিকিৎসক যদি সন্ত্রাসী হুমকির কারণে চেম্বারে যেতে ভয় পান, রোগী দেখতে আতঙ্কিত হন কিংবা স্বাভাবিক পেশাগত কার্যক্রম সীমিত করেন, তার অভিঘাত শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবায় গিয়ে পড়ে। তাই এমন হুমকিকে কোনোভাবেই সাধারণ চাঁদাবাজির মামলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এ ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের আওতায় এনে প্রকৃত নির্দেশদাতা, অর্থের উৎস, যোগাযোগের মাধ্যম এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে হবে। শুধু কয়েকজন বাহককে আটক করলেই হবে না; নেপথ্যের হোতাদের বিচারের মুখোমুখি করাই হতে হবে তদন্তের প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে সাক্ষ্যপ্রমাণ, মুঠোফোন যোগাযোগ, বার্তা, অডিও এবং আর্থিক লেনদেন যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে আদালতে শক্তিশালী মামলা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চাঁদাবাজি দমনে সাময়িক অভিযান নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক ও গোয়েন্দাভিত্তিক ব্যবস্থা। বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসীদের পরিচয় ব্যবহার করে দেশে অপরাধ পরিচালনার পথ বন্ধ করতে আন্তঃসংস্থা সমন্বয়, সীমান্ত নজরদারি, কারাগার থেকে অপরাধ পরিচালনা ঠেকানো এবং ভুক্তভোগীদের দ্রুত নিরাপত্তা দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অপরাধীদের এমন বার্তা দিতে হবে—সন্ত্রাসীর নাম ধার করে হুমকি দিলেও আইনের হাত থেকে রেহাই নেই।
একজন চিকিৎসককে যদি বলা হয়, ‘শত পুলিশ থাকলেও গুলি করা হবে’, তবে সেটি শুধু তাঁকে নয়, রাষ্ট্রকেই দেওয়া হুমকি। সেই হুমকির জবাবও হতে হবে রাষ্ট্রের—আইনের কঠোর, দৃশ্যমান এবং নিশ্চিত প্রয়োগের মাধ্যমে।
সানা/আপ্র/১০/৯/২০২৬