‘আত্মহত্যা সম্পর্কিত ধারণার পরিবর্তন’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আজ, ১০ সেপ্টেম্বর, পালিত হচ্ছে বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। এ বছরের আহ্বান—আত্মহত্যা নিয়ে নীরবতা ও সামাজিক কলঙ্ক ভেঙে কথোপকথন শুরু করা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য হলেও বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৭ লাখ ২৭ হাজার মানুষ আত্মহত্যায় মারা যান। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যা বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ। এসব মৃত্যুর প্রায় ৭৩ শতাংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঘটে।
দিবসটি সামনে রেখে গতকাল রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘নীরবতা থেকে পদক্ষেপ : তরুণদের আত্মহত্যা বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন’ শীর্ষক সচেতনতামূলক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আঁচল ফাউন্ডেশন ও হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এমএ মুহিত বলেন, আত্মহত্যার চেষ্টা করাকে আইনে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার বিধান মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক কলঙ্ক আরও বাড়াচ্ছে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, এ বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিদের অপরাধী হিসেবে না দেখে মানসিক স্বাস্থ্যসহায়তার আওতায় আনা প্রয়োজন। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের আত্মহত্যার চিন্তা আসতে পারে। এ সময় প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে সরকার পাবনা মানসিক হাসপাতালের আধুনিকায়ন, ঢাকার মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালীকরণ এবং কমিউনিটিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো তৈরিতে কাজ করছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছে দিতে টেলি-কাউন্সেলিং ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ‘ইটস গুড টু টক’ নামে একটি প্রচারণা চালুর উদ্যোগের কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আত্মহত্যা মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সমাজের সব পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার বলেন, আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে এমন ব্যক্তিকে দূরে সরিয়ে না দিয়ে পাশে দাঁড়াতে হবে। তাকে কোনোভাবেই অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। সংকটের সময়ে তাকে একা না রেখে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশিদ মোহাম্মদ বলেন, ঝুঁকি কমানো, সামাজিক সহায়তা জোরদার এবং সংকটে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন খাত ও সম্প্রদায়ের মধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, আত্মহত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর চিকিৎসা নিতে গিয়ে যেন কেউ বাধার মুখে না পড়েন, সে জন্য বর্তমান আইন পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করার সময় এসেছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা প্রতিরোধে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা, সামাজিক নেতিবাচক ধারণা দূর করা এবং ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে আত্মহত্যার চেষ্টাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার প্রচলিত আইন পুনর্বিবেচনার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। ২০০৩ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংস্থার সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য ফেডারেশন দিবসটি পালনে একসঙ্গে কাজ করে।
এসি/আপ্র/১০/০৯/২০২৬