বিএনপির সরকারের অতীত কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন সংকটের সমালোচনা করে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে ব্যাপক হট্টগোল হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদে সরকারি দলের সদস্যরা হইচই শুরু করলে একপর্যায়ে অধিবেশন কক্ষ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রুমিনকে অশালীন ভাষায় গালাগাল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রম কিছু সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত হয়।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল’ পাসের আলোচনায় এ ঘটনা ঘটে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি পাসের প্রস্তাব করেন। জনমত যাচাই, বাছাই কমিটিতে পাঠানো ও প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
বিলের আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, ‘প্রত্যেকটা সরকারের একটা চরিত্র থাকে। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট হবে না, এটা হইতে পারে না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আবার সারের সংকট হবে না, গরিব কৃষক সার কারখানায় গিয়ে সেটা লুট করবেন না; সেটাও হতে পারে না।’
এরপর তিনি বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর দুর্নীতিতে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবে না, সেটাও হওয়া সম্ভব না।’
রুমিনের এই বক্তব্যের পর বিএনপির সংসদ সদস্যরা হইচই শুরু করেন। হট্টগোলের মধ্যেও তিনি বক্তব্য চালিয়ে যান। তিনি বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ঋণখেলাপিতে সর্বোচ্চ স্থান অর্জন করবে না, সেটাও হইতে পারে না। সুতরাং বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানে ঋণখেলাপিতে সর্বোচ্চ হওয়া, ৬ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার ওপরে ঋণখেলাপি হওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি।’
সংসদে হট্টগোলের মধ্যে রুমিন বলেন, ‘এত অসহিষ্ণু সংসদ, মনে হয় যেন আওয়ামী লীগের আমলে ফিরে গেছি আমরা। মজা, মন্দ না। আওয়ামী লীগকে যখন বলতাম, তখন তারাও হট্টগোল করত। এখন বিএনপি একই ধরনের আচরণ করছে। আরও খারাপ আচরণ।’
এরপর ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই সংসদে বেশির ভাগ সংসদ সদস্য ঋণখেলাপি হিসেবে পরিচিত। নির্বাচনের আগে নামটা কাটানোর জন্য হাইকোর্টে গিয়ে রিট করা, এগুলো আমাদের পুরোনো সংস্কৃতি। এগুলো আমরা বহুত দেখেছি।’
এ সময় তাঁর নির্ধারিত বক্তব্যের সময় শেষ হয়ে গেলে মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে সংসদে তখনো হইচই চলছিল। রুমিন মাইক ছাড়াই কথা বলতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি ডেপুটি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অভিযোগ করেন, তাঁকে অশালীন ভাষায় গালাগাল করা হয়েছে।
এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদও দাঁড়িয়ে এর প্রতিবাদ করেন। মাইক ছাড়া তাঁকে বলতে শোনা যায়, একজন সংসদ সদস্যকে এভাবে গালি দেওয়া যায় না। তিনি বিরোধী দলের অন্য সদস্যদেরও প্রতিবাদ করার আহ্বান জানান। একপর্যায়ে হান্নান মাসউদ সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। পরে এনসিপির আরেক সদস্য আখতার হোসেন বক্তব্য দিতে দাঁড়িয়ে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে সংশোধনী আনার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
হট্টগোলের সময় অধিবেশনে সভাপতিত্বকারী ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বারবার সংসদ সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, একজন সদস্য বক্তব্য রাখছেন এবং তাঁর কথা বলার স্বাধীনতা আছে। কিন্তু অন্য সদস্যরা তাঁর বক্তব্যে বাধা দিলে তা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বাইরে যায়।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির উদ্দেশে ডেপুটি স্পিকার বলেন, সংসদ সদস্যদের প্রত্যেকের বক্তব্য উপস্থাপনের স্বাধীনতা রয়েছে। কারও বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে নিজের বক্তব্য দেওয়ার সময় তা খণ্ডন করা যাবে। কিন্তু বক্তব্য প্রদানে বাধা দেওয়া কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। তিনি আরও বলেন, অসংসদীয় বক্তব্য থাকলে তা সভাপতির আসন থেকে বাদ দেওয়া যেতে পারে। চিফ হুইপ হিসেবে সংসদের শৃঙ্খলা বজায় রাখাও তাঁর দায়িত্ব।
রুমিন তখনও দাঁড়িয়ে কথা বলতে চাইলে ডেপুটি স্পিকার তাঁকে বসার অনুরোধ করেন। হট্টগোলের মধ্যেই তিনি অন্য এক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমানকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আহ্বান জানান।
‘কী বললেন, সবই তো হারিয়ে গেল’
পরে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সংসদের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, রুমিনের বক্তব্যের সবকিছু সংগত নাও হতে পারে, আবার গুরুত্বপূর্ণ কথাও থাকতে পারে। কিন্তু হট্টগোলের কারণে তাঁর বক্তব্য ঠিকমতো শোনা যায়নি।
শফিকুর রহমান বলেন, কোনো সংসদ সদস্যের বক্তব্য অসংসদীয় হলে স্পিকার তা বাদ দিতে পারেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী তার জবাব দিতে পারেন। কিন্তু হট্টগোলের কারণে ওই বক্তব্যের কিছুই বোঝা যায়নি।
তিনি বলেন, ‘আজকে উনি কী বললেন, আমরা তো একেবারেই বুঝতে পারলাম না। উনি কী গালি দিলেন, না দোয়া দিলেন, কিছুই বুঝলাম না।’
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, সংসদ সদস্যরা সংসদেই সব সমস্যার সমাধান চান। তবে একজন সদস্য যখন বক্তব্য দেন, তখন তাঁর নিজেরও কিছু বিষয়ে দৃষ্টি রাখা দরকার। তিনি বলেন, মাত্র কয়েক দিন আগেও রুমিন বিএনপির পক্ষে কথা বলেছেন।
পরে বিলের আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি তো বিষয় কী, সেটাই বুঝতে পারছি না। আমি কী বললাম, আলোচনা কী হলো?’ তিনি বলেন, সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক একটি আলোচনা সংসদে চলে আসা দুঃখজনক।
পরে সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের কাছে রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেন, বিএনপির সংসদ সদস্যরা তাঁকে অশালীন ভাষায় গালাগাল করেছেন। তবে তিনি কারও নাম উল্লেখ করেননি। এ ঘটনায় চিফ হুইপের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদ কক্ষে উপস্থিত ছিলেন না।
সানা/আপ্র/১০/৯/২০২৬