সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীকে সতর্কবার্তা দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহম্মদ আসিফ। তিনি বলেছেন, সৌদি আরবের ওপর যে কোনো আগ্রাসী হামলা হলে চুক্তিটি সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম জিও নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খাজা আসিফ বলেন, তিন দেশের প্রতিরক্ষা চুক্তির শর্ত মেনে চলতে পাকিস্তান বাধ্য। কোনো আগ্রাসন হলে চুক্তির প্রতি সম্মান জানাবে ইসলামাবাদ। হুথিদের বোঝা উচিত, তাদের কর্মকাণ্ডের ফলে চুক্তিটি কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, ‘ত্রিপক্ষীয় চুক্তির অধীনে তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর আগ্রাসনকে সবার ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এ বিষয়ে কোনো অস্পষ্টতার সুযোগ নেই।’
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, হুথিদের দমন করতে সৌদি আরব ইসলামাবাদের কাছে সরাসরি সহযোগিতা চেয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি এখনো অবগত নন। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, শিগগিরই পরিস্থিতির অবসান হবে।
খাজা আসিফ বলেন, ‘আমি এখনো জানি না যে রিয়াদ ইসলামাবাদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছে কি না। আমরা চাই, শিগগিরই সংঘাতের নিরসন হোক। কিন্তু তা না হলে এবং রিয়াদ যদি ইসলামাবাদের সহযোগিতা চায়, সে ক্ষেত্রে আমরা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সহযোগিতা করতে বাধ্য থাকব।’
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিটি ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় স্বাক্ষর করেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। চুক্তির মূল শর্ত হলো, স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। চুক্তিটি মূলত যৌথ প্রতিরোধ সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে করা হয়েছে।
তিন দেশই জানিয়েছে, চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয় এবং এর প্রকৃতি প্রতিরক্ষামূলক।
সৌদি-হুথি সংঘাতে নতুন উত্তেজনা: সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সংঘাতের নতুন করে অবনতি হয়েছে। ২০১৪ সালে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২০১৫ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে। এরপর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদরাব্বুহ মনসুর হাদির সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করে।
২০২২ সালে হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হলেও চলতি বছরের জুলাই থেকে দুই পক্ষের সম্পর্ক আবার তীব্রভাবে অবনতি হতে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াইও বেড়েছে।
সোমবার ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলায় একটি কারাগারে কয়েকজন নিহত হওয়ার পর উত্তেজনা আরো বাড়ে। এর পরদিন মঙ্গলবার হুথিরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের আবহা, খামিস মুশাইত, জাজান ও নাজরান শহরে হামলা চালায়।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্রের দাবি, এসব হামলায় অন্তত ৭৩ জন আহত হয়েছেন। হামলায় বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে।
হুথিরা অবশ্য দাবি করেছে, সৌদি আরবের সাম্প্রতিক হামলার জবাবেই তারা দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তাদের সামরিক মুখপাত্র সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কথা জানিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যকে সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি ইসলামাবাদের প্রতিশ্রুতির আরো স্পষ্ট প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও হুথিদের হামলার নিন্দা করে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি ইসলামাবাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
মক্কা চুক্তির আওতায় কোনো সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে অন্য দুই সদস্য কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেবে, তা পরিস্থিতি ও আক্রান্ত দেশের অনুরোধের ওপর নির্ভর করবে। ফলে হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত আরো ছড়িয়ে পড়লে পাকিস্তান সরাসরি সামরিকভাবে যুক্ত হবে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। তবে খাজা আসিফের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, সৌদি আরবের ওপর বড় ধরনের আগ্রাসন হলে মক্কা চুক্তির পারস্পরিক প্রতিরক্ষা কাঠামো সক্রিয় করার বিষয়টি ইসলামাবাদ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। সূত্র: রয়টার্স, জিও নিউজ, ব্লুমবার্গ
সানা/আপ্র/১০/৯/২০২৬