হলিউডে হাসির অভিনেতা হিসেবেই অ্যাডাম স্যান্ডলারের পরিচিতি সবচেয়ে বেশি। কখনো অদ্ভুত স্বভাবের মানুষ, কখনো বেখেয়ালি নায়ক, আবার কখনো একেবারে সাধারণ মানুষের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শককে হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেনও। অথচ একটা সময় মানুষকে হাসানোর দৃশ্যে অভিনয় করার কোনো ইচ্ছাই ছিল না তাঁর। কমেডি দিয়ে শুরু হলেও পরে অভিনয়ের নানা ক্ষেত্রে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি চিত্রনাট্য লেখা, প্রযোজনা, গান ও স্ট্যান্ডআপ কমেডিতেও যুক্ত হয়েছেন। ৯ সেপ্টেম্বর ৬০ বছরে পা দিয়েছেন এই তারকা। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সাফল্যের পাশাপাশি গড়েছেন বিপুল সম্পদও।
কমেডিয়ান হওয়ার ইচ্ছা ছিল না
১৯৬৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্ম অ্যাডাম স্যান্ডলারের। পরে তাঁর পরিবার চলে যায় নিউ হ্যাম্পশায়ারের ম্যানচেস্টারে। চার ভাই-বোনের মধ্যে একজন স্যান্ডলার স্কুলজীবন থেকেই হাস্যরসের জন্য পরিচিত ছিলেন। তবে তখনো কমেডিয়ান হওয়ার কথা ভাবেননি তিনি।
১৭ বছর বয়সে বড় ভাইয়ের উৎসাহে বোস্টনের একটি কমেডি ক্লাবে প্রথম মঞ্চে ওঠেন স্যান্ডলার। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। পরে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি স্ট্যান্ডআপ কমেডি করতে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলায় ডিগ্রি নেওয়ার পর বিনোদনজগতে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন।
‘স্যাটারডে নাইট লাইভ’ থেকে বড় পরিচিতি
১৯৮৯ সালে ‘গোয়িং ওভারবোর্ড’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় স্যান্ডলারের। এরপর টেলিভিশনে আসে বড় সুযোগ। ডেনিস মিলারের নজরে পড়ে তিনি ‘স্যাটারডে নাইট লাইভ’ অনুষ্ঠানে কাজের সুযোগ পান।
১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত সেখানে লেখক ও অভিনয়শিল্পী হিসেবে কাজ করেন স্যান্ডলার। এ সময় ‘অপেরাম্যান’ ও ‘ক্যানটিন বয়’-এর মতো চরিত্র তৈরি করে জনপ্রিয়তা পান। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের এই অধ্যায়ও পুরোপুরি মসৃণ ছিল না। একসময় অনুষ্ঠানটি থেকে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। ওই ঘটনায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন।
কমেডির গণ্ডি পেরিয়ে অভিনয়ের স্বীকৃতি
দীর্ঘদিন কমেডি অভিনেতা হিসেবে পরিচিত থাকলেও ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নাটকীয় চরিত্রে অভিনয় করে নিজের সামর্থ্য দেখান স্যান্ডলার। হলিউডে তাঁকে শুধু কমেডিয়ান হিসেবে দেখার প্রবণতার মধ্যেই তিনি ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
‘পাঞ্চ-ড্রাঙ্ক লাভ’-এ তাঁর অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়। এরপর ‘রেইন ওভার মি’ এবং বিশেষ করে ‘আনকাট জেমস’-এ অভিনয় করে কমেডির বাইরেও নিজের শক্তিশালী অভিনয়ক্ষমতার প্রমাণ দেন। তাঁর অভিনয়ের এই ভিন্নমাত্রা তাঁকে শুধু জনপ্রিয় অভিনেতা নয়, একজন বহুমাত্রিক শিল্পী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করে।
এ পর্যন্ত স্যান্ডলারের অভিনীত সিনেমাগুলো বিশ্বব্যাপী ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে।
নেটফ্লিক্সে নতুন সাফল্য
অভিনয়ের পাশাপাশি চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক, গায়ক ও স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন স্যান্ডলার। ২০১৪ সালে হলিউডের প্রচলিত সিনেমা ব্যবসার বাইরে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে বড় ধরনের বিনিয়োগের পথে হাঁটেন তিনি। নেটফ্লিক্সের সঙ্গে একের পর এক সিনেমার চুক্তি করেন।
এসব সিনেমার অনেকগুলোই দর্শকসংখ্যার হিসাবে বড় সাফল্য পায়। ২০১৫ সালে ‘দ্য রিডিকিউলাস ৬’ মুক্তির পর এটি দুই বিলিয়ন ঘণ্টার বেশি দেখা হয়। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে এই সাফল্য স্যান্ডলারের ক্যারিয়ারে নতুন গতি এনে দেয়।
আয় ও বিপুল সম্পদ
অ্যাডাম স্যান্ডলারের আয় সম্পর্কে অন্যতম বড় সূত্র ফোর্বস ম্যাগাজিন। ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত তালিকায় তাঁকে ২০২৫ সালের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া শিল্পীদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তালিকা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তাঁর আয় ছিল ৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার। কর ও অন্যান্য খরচের আগে ওই সময়ে তাঁর মোট আয় ছিল প্রায় ৬ কোটি ডলার।
প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে অ্যাডাম স্যান্ডলারের মোট সম্পদের পরিমাণ ৪৪ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
জীবন সম্পর্কে স্যান্ডলারের দর্শন
বিপুল খ্যাতি ও সাফল্যের পরও জীবনকে শুধু অর্জনের প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখেন না স্যান্ডলার। তাঁর কাছে পরিবার, বন্ধুত্ব, কাজের আনন্দ এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকাই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যক্তিগত জীবনে পরিবারকে তিনি সবচেয়ে বড় আশ্রয় হিসেবে দেখেছেন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাছে জীবনের মূল্যও আরও গভীর হয়েছে। ক্যারিয়ার গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সময় কাটানো তাঁর কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ। নিজের দুর্বলতা ও ব্যর্থতাকে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াও তাঁর জীবনদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ক্যারিয়ারের শুরুতে প্রত্যাখ্যান, ‘স্যাটারডে নাইট লাইভ’ থেকে বরখাস্ত হওয়া কিংবা নানা সমালোচনা—কোনোটিই তাঁকে থামাতে পারেনি। বরং জীবনের কঠিন সময় পার হওয়ার শক্তি হিসেবে হাস্যরসকেই কাজে লাগিয়েছেন তিনি।
তথ্য সূত্র: ফোর্বস ম্যাগাজিন, বায়োগ্রাফি ডটকম, দ্য হলিউড রিপোর্টার্স
সানা/আপ্র/১০/৯/২০২৬