ইন্দোনেশিয়ার একটি সৈকতে বিরল ওরফিশ ভেসে আসার পর দেশটির ছয়টি আগ্নেয়গিরিতে প্রায় একই সময়ে অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় লোকবিশ্বাসে ওরফিশকে ‘কেয়ামতের মাছ’ বা ‘প্রলয়ংকরী মাছ’ বলা হয়। ফলে মাছটির উপস্থিতির সঙ্গে পরবর্তী প্রাকৃতিক দুর্যোগের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা জল্পনা ছড়িয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন কোনো সম্পর্কের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
গত ২৫ আগস্ট স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ইন্দোনেশিয়ার কমোডো দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের পিঙ্ক বিচে প্রায় ১৩ ফুট দীর্ঘ একটি ওরফিশ ভেসে আসে। রাতে সেখানে অবস্থান করা এক পর্যটক সকালে মাছটি প্রথম দেখতে পান। পরে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা মাছটিকে সৈকত থেকে সরিয়ে নেন।
বিরল গভীর সমুদ্রের এই প্রাণী সাধারণত সমুদ্রের অনেক গভীরে বাস করে। ফলে সৈকতে ওরফিশটির ভেসে আসার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল ও কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়। পরে ৩১ আগস্ট ইন্দোনেশিয়ার ছয়টি আগ্নেয়গিরিতে একই দিনে অগ্ন্যুৎপাতের খবর প্রকাশিত হলে ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি হয়।
অগ্ন্যুৎপাত হওয়া ছয় আগ্নেয়গিরি হলো উত্তর সুমাত্রার সিনাবুং, পূর্ব জাভার সেমেরু, উত্তর মালুকুর ইবু, পূর্ব নুসা তেংগারার লেওতোবি লাকি-লাকি ও ইলি লেওতোলোক এবং সুন্দা প্রণালির আনাক ক্রাকাতাউ। ইন্দোনেশিয়ার আগ্নেয়গিরি পর্যবেক্ষণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ছয়টি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান ও বিপুলসংখ্যক সক্রিয় আগ্নেয়গিরির কারণে একই দিনে পৃথক আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাত ঘটতে পারে।
ইন্দোনেশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত। দেশটিতে ১২০টির বেশি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। ফলে একই সময়ে বিভিন্ন আগ্নেয়গিরিতে ভূ-আগ্নেয়গিরীয় তৎপরতা দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়।
ওরফিশের সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা লোকবিশ্বাস রয়েছে। বিশেষ করে জাপানি লোককথায় গভীর সমুদ্রের এই মাছকে অশুভ বার্তাবাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাপানি ভাষায় এর একটি নামের অর্থ ‘সমুদ্র দেবতার প্রাসাদের বার্তাবাহক’। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ভূমিকম্প বা সুনামির মতো দুর্যোগের আগে এই মাছ সমুদ্রের ওপরের দিকে উঠে আসে।
তবে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ওরফিশের উপস্থিতির সঙ্গে ভূমিকম্প, সুনামি কিংবা অন্য কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সরাসরি কারণ-সম্পর্কের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরাও ২৫ আগস্ট পিঙ্ক বিচে ওরফিশ ভেসে আসাকে কোনো আসন্ন দুর্যোগের পূর্বাভাস হিসেবে দেখার কারণ নেই বলে জানিয়েছেন।
এদিকে ওরফিশ ভেসে আসার পরদিন, ২৬ আগস্ট, ইন্দোনেশিয়া থেকে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দূরে নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে। হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। পরবর্তী সময়ে নেপালে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে এবং হাজারো মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।
ফলে ওরফিশ, ছয় আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং নেপালের বন্যার সময়ের কাছাকাছি অবস্থান কৌতূহল তৈরি করলেও, তিনটি ঘটনার মধ্যে কোনো কারণগত সম্পর্ক রয়েছে—এমন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাগুলোকে একই প্রাকৃতিক সংকেত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সানা/আপ্র/১০/৯/২০২৬