ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়া সামরিকভাবে যুক্ত হলে ‘মারাত্মক পরিণতি’ হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে অংশ নেওয়ার বিভিন্ন পথ সিউল বিবেচনা করছে—এমন খবরের পরই ইরানের এই সতর্কবার্তা এসেছে। খবর আল-জাজিরার।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ৭ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালিতে কোনো দেশের সামরিক উপস্থিতি কিংবা সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণকে ইরান ‘আগ্রাসনকারীর প্রতি সরাসরি সমর্থন’ হিসেবে দেখবে। এর পরিণতি কারও জন্যই ভালো হবে না।
ইরানের ভাষ্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে তাদের ৬৪ বছরের বেশি সময়ের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এবং তেহরান এই বন্ধুত্বকে মূল্যায়ন করে। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন এবং ‘নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ’ থেকে নিজেদের রক্ষার সময় দক্ষিণ কোরিয়া যদি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সামরিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়, তাহলে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইসমাইল বাঘাই আরো বলেন, ‘কোনো সার্বভৌম ও দায়িত্বশীল দেশেরই যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও হুমকির মুখে নতি স্বীকার করা উচিত নয়। মহান ইরানি জাতির বিরুদ্ধে চালানো আগ্রাসন ও ভয়ংকর অপরাধের সহযোগী হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
তবে দক্ষিণ কোরিয়া সরাসরি এই বক্তব্যের কোনো জবাব দেয়নি। ৭ সেপ্টেম্বর দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। সাম্প্রতিক সময়ে সিউল সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি পর্যবেক্ষণ দলও পাঠিয়েছে পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য। তবে সামরিক মোতায়েনের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ([জবঁঃবৎং][১])
চাপের মুখে সিউল: যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর কয়েক মাস ধরেই চাপ বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগস্টে বলেছিলেন, তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিউংকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ‘একটু সাহায্য’ করতে বলেছিলেন। ট্রাম্পের দাবি, দক্ষিণ কোরিয়া সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বলেছিল, ‘না, ধন্যবাদ’।
এরপর দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দেয়। ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ কমিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। ১১ দিনের এই মহড়া এবার পাঁচ দিনে নামিয়ে আনা হয়। উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুতি ঝালিয়ে নিতে প্রতিবছর এই মহড়ার আয়োজন করা হয়।
ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে মহড়াগুলোকে ব্যয়বহুল বলে মন্তব্য করেন এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উনের প্রতি এগুলো ‘শত্রুতাপূর্ণ’ বার্তা পাঠায় বলে দাবি করেন। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন পার্লামেন্টে বলেছেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আগাম কোনো সতর্কতা দেয়নি।
সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় আরেকটি সামরিক মহড়াও বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এর কারণ হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া সামরিক সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে।
হরমুজে কী করতে চায় দক্ষিণ কোরিয়া: দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা ৫ সেপ্টেম্বর জানান, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে অংশ নেওয়ার বিভিন্ন পথ খুঁজছে সিউল। এর মধ্যে সামরিক সহায়তার বিষয়টিও রয়েছে।
সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে সমুদ্র টহল বিমান, রসদ সরবরাহকারী নৌযান এবং সমুদ্রের নিচে থাকা মাইন শনাক্ত ও অপসারণের সরঞ্জাম পাঠানোর বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টিও বিবেচনা করছে দক্ষিণ কোরিয়া। তবে যেকোনো পদক্ষেপ দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিকে বিঘ্নিত না করে নিতে হবে।
সিউল এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, হরমুজে নৌ চলাচলের নিরাপত্তায় দক্ষিণ কোরিয়ার সম্ভাব্য অবদান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে; সরাসরি সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
কোরিয়া যুদ্ধের পর দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক অগ্রগতিতে ব্যাপক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একটি চুক্তির আওতায় যুদ্ধের পর থেকেই কোরিয়া উপদ্বীপে স্থায়ীভাবে প্রায় ২৯ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। পরমাণু শক্তিধর উত্তর কোরিয়াকে মোকাবিলায় সিউল ওয়াশিংটনের সামরিক সুরক্ষার ওপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল।
প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং তুলনামূলক উদারপন্থী। তিনি সামরিক শক্তি প্রদর্শনের চেয়ে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পক্ষে। তাঁর কার্যালয়ও আগে জানিয়েছিল, তারা ট্রাম্পের সঙ্গে একটি ‘অর্থপূর্ণ আলোচনা’ করতে চায়।
দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়োনহাপ বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, সিউলের ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। তবে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এবং দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিকে বিঘ্নিত করে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।
সরকার এমন পদক্ষেপ নিলে দেশের ভেতরেও তীব্র অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিরোধী দল এর বিরোধিতা করেছে। ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির কয়েকজন সদস্যও সম্ভাব্য মোতায়েনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অনেক সাধারণ দক্ষিণ কোরীয়ও ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন।
ফলে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, অন্যদিকে ইরানের হুমকি এবং দেশের ভেতরের বিরোধিতা—সব মিলিয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছে সিউল।
যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার পুরোনো মিত্রতা: কোরিয়া যুদ্ধের পর দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক অগ্রগতিতে ব্যাপক সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিদান হিসেবে অতীতে ইরাক যুদ্ধসহ যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি সামরিক অভিযানে সমর্থন জুগিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। ন্যাটোর সদস্য না হলেও ওয়াশিংটন সিউলকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে। ২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে ওয়াশিংটন। এতে দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা তৈরি হয়। সিউল তখন পাল্টা ব্যবস্থা না নিয়ে সমঝোতার পথ বেছে নেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র শুল্কের হার কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে জর্জিয়ায় হুন্দাইয়ের একটি কারখানায় মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক বিভাগের অভিযানে শত শত দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক গ্রেফতার হন। এ ঘটনায় দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়।
গত বছরের অক্টোবরে এক রাষ্ট্রীয় সফরে সিউলে যান ট্রাম্প। চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রেসিডেন্ট লিও যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে আবার আলোচনা শুরুর চেষ্টাও চালাচ্ছেন লি।
সামনে কঠিন সমীকরণ: বর্তমানে তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটির অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ৬০ শতাংশের বেশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। ফলে চলমান সংঘাতে হরমুজের নৌপথে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়া দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
যুদ্ধের প্রভাবে দেশটিতে জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপও বেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার মুদ্রা ওনের মানও দুর্বল হয়েছে। তাই হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখায় সিউলের নিজস্ব বড় অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। একই সঙ্গে এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ালে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
কিন্তু তেহরানের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে সামরিকভাবে যুক্ত হলে ইরানের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক আরো অবনতির ঝুঁকি তৈরি হবে। দেশের ভেতরেও বিরোধিতা রয়েছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা এবং উত্তর কোরিয়ার হুমকির বাস্তবতাও সিউলের সিদ্ধান্তকে জটিল করে তুলেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার আইন অনুযায়ী বিদেশে সেনা পাঠানোর ক্ষেত্রে পার্লামেন্টের অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শেষ পর্যন্ত হরমুজে কী ধরনের সহায়তা দেবে সিউল—সেটি শুধু ওয়াশিংটন বা তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্ন নয়; বরং দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, জনমত ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভারসাম্যের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
সানা/আপ্র/১০/৯/২০২৬