দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকলেও জাতীয় সংসদ ও বিদ্যুৎমন্ত্রীর বাড়িতে বিদ্যুৎ আছে—এমন মন্তব্য করে সরকারের কাছে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণ বিদ্যুৎ, গ্যাস, নিরবচ্ছিন্ন পানি ও সহনীয় দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য চায়। অথচ সরকার বলছে দেশে কোনো সংকট নেই। তাঁর প্রশ্ন, সরকারের এ দাবি সত্য না মিথ্যা?
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টার দিকে ফেনীর মহিপালে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে এ লংমার্চের আয়োজন করা হয়।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশবাসী ভালো নেই। এই মুহূর্তে কি বিদ্যুৎ আছে? নেই। ঢাকা থেকে আসার পথে বিভিন্ন দোকান, মার্কেট, ঘরবাড়ি ও শিল্পকারখানা দেখেছি। কোথাও বিদ্যুৎ নেই। কিন্তু বিদ্যুৎ আছে কোথায় জানেন? জাতীয় সংসদের ভেতরে। বিদ্যুৎ আছে বিদ্যুৎমন্ত্রীর বাড়িঘরে। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে বলেন, কোনো সংকট নেই। এটা সত্য না মিথ্যা আপনারা বলেন?’
তিনি বলেন, মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে যারা মিথ্যা কথা বলতে পারেন, তাঁদের দিয়ে দেশের মানুষের কোনো সমস্যার সমাধান হবে না।
লংমার্চে অংশ নেওয়া মানুষের দাবির কথা তুলে ধরে জামায়াতের আমির বলেন, জনগণ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন পানি এবং সহনীয় দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য চায়। একই সঙ্গে তারা ওসমান হাদি, শাপলা গণহত্যা, পিলখানায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ড, গত ১৫ বছরের বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার চায়।
সরকার এসব বিচার করবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। শফিকুর রহমান বলেন, ছয় মাস চলে গেলেও একটি বিচারেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যতটুকু কাজ হয়েছিল, এরপর আর তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, জনগণ দুটি ভোট দিয়েছে—একটি সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য, অন্যটি নিরাপদ ও সংস্কারকৃত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে তা পুরোপুরি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি। ছয় মাস বা ১৮০ দিন চলে যাচ্ছে, এরপর গণভোটের রায়ের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেবে।
তিনি বলেন, জনগণের দাবি মেনে নেওয়া সরকারের কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি তাদের দেওয়া ওয়াদা বাস্তবায়নের বিষয়। জনগণের ভোটকে অবহেলা ও অপমান করে অতীতে যারা ক্ষমতায় ছিল, তাদের করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে।
দেশত্যাগের প্রসঙ্গ টেনে শফিকুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগের ‘গড ব্রাদাররা’ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছিলেন। এখন তাঁদের খুঁজে পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, তাঁদের কোনো পিসির বাড়ি বা দাদাবাবুর বাড়ি নেই; বাংলাদেশই তাঁদের ঠিকানা। অত্যাচার-নির্যাতনের মধ্যেও তাঁরা দেশ ছেড়ে যাননি এবং ভবিষ্যতেও দেশের মানুষের সঙ্গে থাকবেন।
ফেনী জেলা জামায়াতের আমির মুফতি আবদুল হান্নানের সভাপতিত্বে পথসভায় বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এবি পার্টির মুজিবুর রহমান মঞ্জু, এলডিপির কর্নেল (অব.) অলি আহমদসহ ১১ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদে সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র চালু করেছে বিএনপি। দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের কারণে দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং তেল-গ্যাসসহ চলমান সংকটের সমাধান না হলে সরকার গদিতে থাকতে পারবে না।
এদিকে লংমার্চ চট্টগ্রামের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পর সন্ধ্যায় সীতাকুণ্ড পৌর সদরে আয়োজিত আরেক পথসভায় শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার আগে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কোনোটি পূরণ করেনি। দুই-একটি কার্ড বিতরণ ছাড়া জনগণের জন্য কিছুই করা হয়নি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের সংকটে মানুষ শান্তিতে নেই। দেশের টাকা দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের পকেটে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ক্ষমতায় আসার পর সরকার প্রথম বেইমানি করেছে জুলাইয়ের যোদ্ধাদের সঙ্গে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখন তা অস্বীকার করা হচ্ছে। জনগণের দেওয়া গণভোটের রায় তাঁরা ছেড়ে দেবেন না এবং এই দাবি আদায় করে ছাড়বেন বলেও ঘোষণা দেন।
এর আগে সকালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে শফিকুর রহমান ছয় দফার সঙ্গে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আরও একটি দাবি যুক্ত করার কথা বলেন। তিনি বলেন, কোনো চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজের অস্তিত্ব বরদাশত করা হবে না।
লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে হওয়ার কথা রয়েছে। শনিবার দুপুরের পর থেকেই সেখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মীরা জড়ো হতে শুরু করেন।
১১ দলীয় ঐক্য জানিয়েছে, চট্টগ্রামের পর আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর, ৩১ অক্টোবর খুলনা এবং ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে লংমার্চ করবে তারা। এরপর ঢাকায় বড় সমাবেশের কর্মসূচিও রয়েছে।
সানা/আপ্র/৫/৯/২০২৬