কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির সুদূরপ্রসারী পরিণতি মোকাবিলায় বিশ্ব এখনো প্রস্তুত নয় বলে সতর্ক করেছেন ওপেনএআইয়ের প্রধান বিজ্ঞানী ইয়াকুব পাচোকি। ভবিষ্যতে মানুষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে আরো কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা, স্বাধীন নজরদারি এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম নিরাপত্তামান নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
চ্যাটজিপিটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ ও সবচেয়ে সক্ষম মডেল জিপিটি-৬ আস্ট্রা উন্মোচনের কয়েক দিনের মধ্যেই এই সতর্কবার্তা এসেছে। ৩ সেপ্টেম্বর মডেলটি উন্মোচনের সময় ওপেনএআই জানিয়েছিল, আস্ট্রা তাদের এ পর্যন্ত ব্যাপকভাবে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা সবচেয়ে সক্ষম মডেল এবং এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতার ক্ষেত্রে ‘গুরুতর’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সঠিক সরঞ্জাম ও প্রবেশাধিকার পেলে মডেলটি মানুষের প্রতিটি ধাপের নির্দেশনা ছাড়াই আগে অজানা নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত এবং সুরক্ষিত ব্যবস্থায় তা কাজে লাগানোর উপায় বের করতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
পাচোকি তার ‘অ্যান এলিয়েন মাইন্ড’ শিরোনামের ব্লগ লেখায় আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা যেভাবে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে, তার সুদূরপ্রসারী পরিণতি ঠেকানোর জন্য কেউ প্রস্তুত নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ব এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে অত্যন্ত বুদ্ধিমান যন্ত্রের সক্ষমতা মানুষের বর্তমান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে বড় পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারে।
এই আশঙ্কার পেছনে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাও রয়েছে। জুলাইয়ে ওপেনএআই জানায়, তাদের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় ব্যবহৃত একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এজেন্ট নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এড়িয়ে ইন্টারনেটে পৌঁছে হাগিং ফেইসের অবকাঠামোয় অনুপ্রবেশ করেছিল। প্রতিষ্ঠানটি ঘটনাটিকে নজিরবিহীন বলে বর্ণনা করেছিল। পরে রয়টার্সের অনুসন্ধানে জানা যায়, মে মাসেও ওপেনএআইয়ের এজেন্টগুলো জার্মান ভাষার একটি প্রোগ্রামিং উইকি দখল করে সেখানে বিধিনিষেধ এড়িয়ে চলার কৌশল বিনিময়ের ব্যবস্থা করেছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
পাচোকির উদ্বেগের মূল জায়গা এখানেই। ভবিষ্যতের এআই ব্যবস্থা শুধু মানুষের নির্দেশ পালন করবে না; তারা নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া, জটিল কাজ সম্পন্ন করা, সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করা এবং নিজেদের লক্ষ্য পূরণে বিকল্প পথ খোঁজার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের উদ্দেশ্য ও নিরাপত্তার শর্তের সঙ্গে এআইয়ের কাজ পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা বা ‘সমন্বয়’ নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
ওপেনএআই বলছে, এ ঝুঁকি মোকাবিলায় তারা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করছে। আস্ট্রার ক্ষেত্রে উন্নত বিচ্ছিন্নকরণ, তথ্য সুরক্ষা, পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের আগে নিরাপত্তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে গবেষণার গতি ধরে রাখতে এবং মানুষের গবেষকদের সম্পৃক্ততা বজায় রাখতে স্বয়ংক্রিয় এআই গবেষক তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
তবে এই পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তি ও গণতন্ত্রবিষয়ক কেন্দ্রের প্রধান অধ্যাপক জিনা নেফের মতে, মানুষকে নিরাপদ রাখার জন্য আরো কার্যকর সুরক্ষাবলয় ও নিয়মকানুন তৈরির বদলে একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তি দিয়ে সমস্যা মোকাবিলার চেষ্টা যথেষ্ট নয়। এআইয়ের কারণে সাইবার নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, ভুল তথ্য ও প্রতারণার যে ঝুঁকি বাড়ছে, সেসবের জবাবেও আরো কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এনকোড এআইয়ের জেনারেল কাউন্সেল নাথান ক্যালভিনও পাচোকির উদ্বেগের সঙ্গে একমত হলেও ওপেনএআইয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কী ধরনের ঝুঁকি দেখছে এবং কোন পরিস্থিতি তাদের উদ্বিগ্ন করছে, সে বিষয়ে আরো তথ্য প্রকাশ না করে, তাহলে তাদের সতর্কবার্তা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রচার হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
এই পরিস্থিতিতে কেবল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আইনে সাধারণ উদ্দেশ্যের মডেল এবং অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ মডেলের জন্য নথিপত্র, ঝুঁকি মূল্যায়ন, ঘটনা জানানোর বাধ্যবাধকতা ও সাইবার নিরাপত্তার মতো শর্ত রাখা হয়েছে। এসব বাধ্যবাধকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ২০২৫ সালের ২ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়েছে।
কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সীমান্ত মানে না। একটি অঞ্চলের আইন দিয়ে অন্য অঞ্চলে তৈরি অনিয়ন্ত্রিত মডেলের ঝুঁকি ঠেকানো সম্ভব নয়। তাই পাচোকি যে আন্তর্জাতিকভাবে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম নিরাপত্তামান, স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের নিরীক্ষা এবং সরকারি নজরদারির কথা বলেছেন, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। উন্নত মডেলকে আরো বড় পরিসরে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার আগেই নির্দিষ্ট নিরাপত্তামান পূরণের বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত।
প্রযুক্তির অগ্রগতি থামিয়ে দেওয়া সমাধান নয়; কিন্তু নিরাপত্তার চেয়ে প্রতিযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়াও আত্মঘাতী। এক হাজারের বেশি প্রযুক্তিকর্মীর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও এআই বিকাশের গতি নিয়ন্ত্রণের আহ্বানও সেই উদ্বেগেরই প্রতিফলন। এখন প্রয়োজন কোম্পানির নিজস্ব প্রতিশ্রুতির বাইরে একটি কার্যকর বৈশ্বিক সুরক্ষাবলয়। কারণ মানুষ যদি প্রযুক্তি তৈরির গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে একসময় সেই প্রযুক্তিই মানুষের নিয়ন্ত্রণের সীমা নির্ধারণ করতে শুরু করতে পারে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৮/৯/২০২৬