মোহাম্মদ ইয়াছিন
প্রত্যেক শিশু তার মা-বাবার কাছে পরম আদরের। নিজের রক্তকণিকাকে সুস্থ ও সুন্দরভাবে বাঁচিয়ে রাখতে প্রত্যেক মা-বাবা তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, সন্তানের জন্য তাদের এত ত্যাগ- যার মুখে ভালো খাবার তুলে দেওয়ার জন্য তাদের সারাদিনের নিরন্তর ছুটে চলা, সেই সন্তানকে তাদের দ্বারাই দেওয়া হচ্ছে বিষ সমতুল্য ভেজাল খাবার। তাদের অজান্তেই সুস্থ জীবনের বদলে সন্তান পাচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা ও নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা।
অতিরিক্ত মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা লাভের জন্য শিশুখাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে থাকেন। তাদের ভেজালকৃত পণ্যের মধ্যে বিভিন্ন প্যাকেটজাত দুধ, ফাস্টফুড, আইসক্রিম, চকোলেট, চিপস, ফলের জুস ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সাধারণত দুধের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য এতে পানি মেশানো হয়- যা দুধের স্বাদ ও গুণগত মান নষ্ট করে। এছাড়া দুধকে ঘন ও তাজা দেখানোর জন্য ডিটারজেন্ট ব্যবহার করা হয় যা শিশুর শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ ছাড়া দুধকে বেশিদিন সংরক্ষণ করার জন্য ফরমালিন মেশানো হয়- যা দীর্ঘমেয়াদি ক্যানসারের কারণ হিসেবে কাজ করে।
অন্যদিকে আইসক্রিম, মিষ্টি, চকোলেট, ফলের জুসকে আকর্ষণীয় ও মুখরোচক দেখানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের মাত্রারিক্ত কৃত্রিম রঙ ও বিভিন্ন ফ্লেভার ব্যবহার করা হয়- যা শিশুদের বিভিন্ন ধরনের আচরণগত সমস্যা, অ্যালার্জি ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। চিপস, বিস্কিট ও অন্যান্য প্যাকেটজাত স্ন্যাকস ও ফাস্টফুডে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও ট্রান্স ফ্যাট নামক অস্বাস্থ্যকর চর্বি থাকে- যা শিল্পকারখানায় তরল তেলকে আংশিক হাইড্রোজেনেশন প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয়। এটি শিশুদের শরীরে উচ্চ ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন হ্রাস করে নিম্ন ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন বৃদ্ধি করে। এ ছাড়া হৃদরোগ, স্থূলতা, ফ্যাটি লিভার ও ডায়াবেটিস রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি খাবারগুলোকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন নামি-দামি কোম্পানির ব্র্যান্ডের সিল, লোগো, প্যাকেটের আড়ালে বিভিন্ন সুপারশপ-শপিংমলে বিপুল দামে বিক্রি করা হয়। ফলে সাধারণ মানুষজন জানতেই পারছে না তাদের সন্তানদের জন্য ভেজালযুক্ত খাবার নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। এসব কাজে অনেক সময় সিন্ডিকেট ও বড় অঙ্কের মুনাফাধারী বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও জড়িত থাকে।
ইউনিসেফের ‘দ্য স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ডস চিলড্রেন’ রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী শিশুদের পুষ্টিহীনতা এবং ত্রুটিপূর্ণ খাদ্যব্যবস্থার কারণে তাদের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে- যার পরিমাণ গত কয়েক দশকে তুলনামূলক বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। অথচ ভেজাল মিশ্রিত খাদ্যগুলো শুধু এ শিশুদের ভবিষ্যৎই নষ্ট করে না; একই সঙ্গে ধ্বংস করে একেকটি প্রজন্ম, পরিবার ও দেশ। তাই খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ভেজাল খাদ্য প্রস্তুতকারীদের বিরুদ্ধে মাঠপর্যায়ে অভিযান, বাজার তদারকি ও ভেজাল মিশ্রিতকারীদের কঠোর শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে।
উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান উদাহরণস্বরূপ- সুপারশপ, শপিংমল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ নজরদারি ও সতর্ক করার মাধ্যমে খাদ্যে ভেজাল রোধ করা যাবে। তবে আইন আর প্রশাসনেরই শুধু এ দায়িত্ব নয়- এ লড়াইয়ের প্রথম প্রতিরক্ষাব্যূহ গড়ে উঠতে হবে প্রতিটি পরিবার থেকে। যতটা সম্ভব প্যাকেটজাত পণ্য এড়িয়ে চলা, সচেতনভাবে খাদ্য বেছে নেওয়া এবং প্রশ্ন তুলতে শেখাই হতে পারে আমাদের শিশুদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ঢাল। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার শিশুদের যথাযথ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের মাধ্যমে আর তা সুরক্ষিত রাখার দায় আমাদের সবার, আজই, এই মুহূর্ত থেকেই।
লেখক: শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/২৬.০৭.২০২৬