ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পাঠদানের মান ও পেশাদারত্ব শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে মূল্যায়ন শুরু করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। এ জন্য ‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেছে সংগঠনটি। তবে ডাকসুর এই উদ্যোগকে এখতিয়ারবহির্ভূত বলে প্রশ্ন তুলেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রশাসনের ভাষ্য, শিক্ষক মূল্যায়ন ডাকসুর কাজ নয়; এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ডাকসু ভবনে সংবাদ সম্মেলন করে ওয়েবসাইটটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ডাকসুর নেতারা জানান, শিক্ষার্থীরা এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিজেদের বিভাগের শিক্ষকদের নির্দিষ্ট মানদণ্ডে মূল্যায়ন করতে পারবেন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন শিক্ষকের রেটিংও ওয়েবসাইটে দেখা যাচ্ছে। কারও রেটিং পাঁচের মধ্যে পাঁচ, আবার কারও এক বা দুই।
শিক্ষকদের মূল্যায়নে কোর্সের কাঠামো ও পাঠ্যসূচি, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, পেশাদারত্ব এবং সার্বিক সন্তুষ্টির মতো বিষয় রাখা হয়েছে। এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে রেটিং দেওয়া হচ্ছে।
ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া জানান, কোনো শিক্ষার্থী তার একাডেমিক ই-মেইল ব্যবহার করে ওয়েবসাইটে প্রবেশের চেষ্টা করলে ওই ই-মেইলে একটি কোড পাঠানো হবে। কোড ব্যবহার করে প্রবেশের পর তিনি শুধু নিজের বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন। অন্য বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়নের সুযোগ থাকবে না।
ডাকসুর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই দিন আগে ওয়েবসাইটটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়। এরই মধ্যে প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষকদের মূল্যায়ন করেছেন। আগামী সাত দিন পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলবে। এ সময়ে পাওয়া সমালোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে।
এরপর তিন মাসের মূল্যায়ন ও মতামতের ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ডাকসু।
রাফিয়া বলেন, ডাকসুর নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি ছিল। দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করেও বিষয়টির প্রশাসনিক সমাধান না হওয়ায় ডাকসুর উদ্যোগে ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়েছে।
ডাকসুর সহসভাপতি সাদিক কায়েম বলেন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধ তৈরি করা নয়, পাঠদানের মান উন্নয়ন এবং কার্যকর মতামত গ্রহণের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা, ক্লাস টেস্ট, মিডটার্ম ও সেমিস্টার ফাইনালের মাধ্যমে নিয়মিত মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু শিক্ষকদের পাঠদান কীভাবে হচ্ছে বা কোথায় উন্নতির প্রয়োজন, সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মতামত নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা এত দিন ছিল না।
সাদিক কায়েমের দাবি, ডাকসু দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেছে। কিন্তু এক বছরেও প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি বাস্তবায়িত না হওয়ায় ডাকসুর উদ্যোগে ওয়েবসাইট চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে ডাকসুর উদ্যোগকে ‘অনধিকার চর্চা’ বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. খোরশেদ আলম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, শিক্ষক মূল্যায়নের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। এ ক্ষেত্রে ডাকসু কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করতে বা চাপ তৈরি করতে পারে।
খোরশেদ আলমের আশঙ্কা, অনানুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকদের রেটিং দেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে ‘মব’-এ রূপ নিতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক মূল্যায়নের ইতিবাচক ফলাফল থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন বলে মত দেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্যও স্পষ্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ ডাকসুর কাজের মধ্যে পড়ে না। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের বিষয়ে নিজেদের মতামত জানাতে পারেন এবং আন্তর্জাতিকভাবেও এ ধরনের রেটিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ডাকসুর ওয়েবসাইটের এই রেটিং কোনো আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন নয়।
অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে শিক্ষকেরা তাদের অবস্থান ও উন্নতির ক্ষেত্র সম্পর্কে জানতে পারবেন। একই সঙ্গে কারা শিক্ষকদের মূল্যায়ন করবেন, সেটিও নির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে ঠিক করা দরকার। তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের পাঠদান মূল্যায়নের জন্য নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে এবং তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদিত হয়েছে। এখন শুধু এর বাস্তবায়ন বাকি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীও ডাকসুর এই উদ্যোগকে সঠিক মনে করেন না। তার ভাষ্য, শিক্ষক মূল্যায়ন প্রশাসনের কাজ এবং এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্রিয়া শেষের দিকে। নির্দিষ্ট নীতিমালা মেনেই তা করা হচ্ছে। তিনি জানান, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন। কোন শিক্ষার্থীরা মূল্যায়ন করবেন, সে বিষয়টিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করেছে। তার মতে, এমন কোনো শিক্ষার্থী যদি শিক্ষককে মূল্যায়ন করেন, যিনি নিজেই ক্লাসে উপস্থিত থাকেন না, তাহলে সেই মূল্যায়ন যৌক্তিক হবে না।
অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী বলেন, ‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’ নামে ডাকসুর প্রকাশ্য ওয়েবসাইট তৈরি করে শিক্ষক মূল্যায়ন করা কোনোভাবেই সঠিক নয়। ফলে শিক্ষক মূল্যায়ন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু ও প্রশাসনের উদ্যোগ এখন মুখোমুখি অবস্থানে। ডাকসু শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে মূল্যায়ন চালিয়ে তিন মাস পর প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলছে। অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক মূল্যায়ন শুরু হবে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১১/৯/২০২৬