রাশিয়ায় ইলেকট্রিশিয়ান ও প্লাম্বিংয়ের কাজের কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ময়মনসিংহের নান্দাইলের আল মামুনকে। বলা হয়েছিল, মাসে দেড় লাখ টাকা বেতনে কাজ করবেন। কিন্তু দেশ ছাড়ার কয়েক দিনের মধ্যেই বদলে যায় তার জীবনের গল্প। রুশ ভাষায় একটি চুক্তিতে সই করানোর পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সেনাক্যাম্পে। পরে মাত্র ২১ দিন পর্যন্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো হয় ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের সম্মুখসারিতে। এখন তার পরিবার পেয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে তার মৃত্যুর খবর।
মামুনের বয়স ২৪ বছর। তিনি নান্দাইল উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের খারুয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেম ও রোকেয়া খাতুন দম্পতির একমাত্র ছেলে। স্ত্রী মহিমা আক্তার, সাড়ে চার বছরের ছেলে আরিয়ান মাহমুদ মাহিন এবং পাঁচ মাস বয়সি মেয়ে আরিশফাকে রেখে চলতি বছরের ৭ মে রাশিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন তিনি।
অভাবের সংসারে স্বস্তি ফেরানোর আশায় ঋণ-দাদন করে এবং গরু বিক্রি করে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা খরচ করে ছেলেকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিলেন মা রোকেয়া খাতুন। তার আশা ছিল, ছেলে কয়েক বছর কাজ করে ঋণের টাকা পরিশোধ করবেন, পরিবারের অসচ্ছলতা দূর হবে এবং ভাঙা ঘরের জায়গায় পাকা ঘর উঠবে। এখন সেই মায়ের একমাত্র আকুতি, যেভাবেই হোক ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।
মামুনের মৃত্যুর খবর পরিবারকে দিয়েছেন তার সঙ্গে রাশিয়ায় যাওয়া ঝিনাইদহের রাজন হোসেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হওয়ার পর হাসপাতাল থেকে পালিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
রাজন জানান, তাদের ৩০ বাংলাদেশির দলের সঙ্গে একজন রুশভাষী কমান্ডার ছিলেন। তার সঙ্গে যোগাযোগ থাকায় বাংলাদেশিদের বিষয়ে কিছু তথ্য জানতে পারতেন তিনি। ওই কমান্ডারের কাছ থেকেই সোমবার মামুনের মৃত্যুর খবর পান।
রাজন বলেন, কমান্ডার তাকে জানিয়েছেন, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ড্রোন হামলায় মামুন মারা গেছেন। এরপর তিনি মামুনের পরিবারকে বিষয়টি জানান।
রুশ ভাষায় চুক্তিতে সই: মামুনের পরিবারের সদস্যরা জানান, দালালরা বলেছিল, রাশিয়ায় গিয়ে দুই-তিন বছর ইলেকট্রিকের কাজ করলেই ঋণের টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হবে। পরিবারের অসচ্ছলতাও দূর হবে। সেই আশাতেই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন মামুন।
একই ফ্লাইটে রাশিয়ায় যাওয়া রাজন হোসেন বলেন, তাদের ৩০ বাংলাদেশির দলটি ৮ মে রাশিয়ায় পৌঁছায়। কয়েক দিন পর ১২ মে ব্যাংক কার্ড, সিম কার্ড, চাকরি ও বসবাসের কাগজপত্র দেওয়ার কথা বলে তাদের একটি চুক্তিতে সই করানো হয়। কিন্তু চুক্তিটি রুশ ভাষায় লেখা থাকায় তারা এর বিষয়বস্তু বুঝতে পারেননি। পরে জানতে পারেন, সেটি ছিল রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চুক্তি।
মামুনের স্ত্রী মহিমা আক্তার বলেন, ইলেকট্রিকের কাজের কথা বলেই তার স্বামীকে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। তিনি যুদ্ধ করতে যাননি।
তার অভিযোগ, দালালেরা প্রতারণা করে মামুনসহ একই দলের ৩০ বাংলাদেশিকে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে নিয়ে যায়।
সর্বোচ্চ ২১ দিনের প্রশিক্ষণ: রাজন জানান, চুক্তিতে সই করানোর পর তাদের সেনাক্যাম্পে নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কারও প্রশিক্ষণ চলে ১০ দিন, কারও ১৫ দিন এবং সর্বোচ্চ ২১ দিন। এরপর তাদের ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়।
রাজনের দাবি, ১২ জুন তাদের যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। ১৪ জুন ড্রোন হামলায় ১৭ বাংলাদেশি নিহত হন। তাদের কেউ ড্রোন হামলায়, আবার কেউ মাইন বিস্ফোরণে মারা যান।
সেদিনের হামলায় নিজেও আহত হন বলে জানান রাজন। তার ভাষ্য, মাথার ওপর ড্রোন ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটছিল। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে পালিয়ে ১৮ আগস্ট তিনি বাংলাদেশ দূতাবাসে যান। পরে রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সহযোগিতায় ২৩ আগস্ট দেশে ফেরেন।
রাজনের দাবি, একই ফ্লাইটে রাশিয়ায় যাওয়া ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে অন্তত ১৭ জন যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই নিহত হয়েছেন। আরো কয়েকজনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
১৯ আগস্ট শেষ বার্তা: রাশিয়ায় যাওয়ার পর স্ত্রী মহিমা আক্তারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে না পারলেও ভয়েস বার্তা ও ছবি পাঠাতেন মামুন। সর্বশেষ ১৯ আগস্ট তিনি একটি ভয়েস বার্তা পাঠান। এরপর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
মহিমা বলেন, তার স্বামী ওই বার্তায় ভয় ও শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তার মাথার ওপর দিয়ে ড্রোন ঘুরছে, কখন কী ঘটে বলা যায় না। সন্তানদের দেখে রাখার কথাও বলেছিলেন তিনি।
মহিমা বলেন, স্বামীর সেই কথাই এখন বারবার মনে পড়ছে।
মন্ত্রণালয়ে গিয়েও মেলেনি সমাধান: মামুনকে রাশিয়ায় পাঠানোর প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন তার খালা-শাশুড়ি মোসাম্মৎ কোবিলা আক্তার। তিনি জানান, প্রায় দুই বছর আগে মামুনকে রাশিয়ায় পাঠানোর জন্য কাগজপত্র দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন ভিসা না হওয়ার পর ‘জাবাল-এ নূর’ নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে তার ভিসা হয়।
৩০ বাংলাদেশিকে মাসে দেড় লাখ টাকা বেতনের চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
কোবিলা আক্তারের দাবি, রাশিয়ায় যাওয়ার পর মামুনদের রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিতে সই করানোর বিষয়টি জানতে পেরে তারা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেন। সেখানে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল, বাংলাদেশিদের যুদ্ধে পাঠানো হবে না।
কিন্তু তাদের সমস্যার সমাধান হয়নি। পরে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে বারবার যোগাযোগ করেন তারা। এমনকি এ ঘটনায় মামলা করার জন্য থানায়ও যোগাযোগ করা হয়েছিল বলে জানান পরিবারের সদস্যরা। তবে আশ্বাস ছাড়া তেমন কোনো সমাধান তারা পাননি।
কোবিলা আক্তারের অভিযোগ, ‘জাবাল-এ নূর’ এজেন্সির মাধ্যমেই প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। ওই এজেন্সির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ছেলে নেই, রয়ে গেছে ঋণের বোঝা: মামুনকে রাশিয়ায় পাঠাতে পরিবারের খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা। এই টাকা জোগাড় করতে ঋণ করতে হয়েছে, নিতে হয়েছে দাদন। এমনকি গরুও বিক্রি করতে হয়েছে।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, ধানের ওপর প্রায় চার লাখ টাকা দাদন নেওয়া হয়। পাশাপাশি একটি এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল। বাকি টাকা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার এবং গরু বিক্রি করে জোগাড় করা হয়।
এখন একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে ঋণের বোঝা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে পরিবারটি।
রোকেয়া খাতুন বলেন, তার একমাত্র ছেলে বিদেশে গিয়েছিলেন পরিবারের ভাগ্য বদলানোর জন্য। সাড়ে আট লাখ টাকা ঋণ করে তাকে পাঠানো হয়েছিল। এখন ছেলে নেই, কীভাবে নাতি-নাতনিদের বড় করবেন, তা জানেন না তিনি।
শুধু মরদেহ ফেরার অপেক্ষা: মামুনের মৃত্যুর সঠিক সময়, কোথায় তার মৃত্যু হয়েছে কিংবা মরদেহ বর্তমানে কোথায় রয়েছে - এসবের কোনো তথ্যই পরিবারের কাছে নেই। তারা শুধু জানেন, ভাগ্য বদলাতে বিদেশে যাওয়া পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি আর কোনোদিন ঘরে ফিরবেন না।
ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে রোকেয়া খাতুনের একটাই দাবি - যেভাবেই হোক তার ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। তিনি শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখতে চান।
দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, যাঁরা তার ছেলেকে প্রতারণা করে যুদ্ধের ময়দানে পাঠিয়েছেন, তাদের বিচার চান তিনি।
এদিকে নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা জান্নাত বলেন, মামুনের মৃত্যুর বিষয়টি তার পরিবার মৌখিকভাবে জানিয়েছে। পরিবারকে লিখিত আবেদন দিতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, লিখিত আবেদন পাওয়ার পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রবাসী কল্যাণ শাখার মাধ্যমে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানানো হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১১/৯/২০২৬