১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন সামনে রেখে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্যস্ত কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। সম্মেলনে যোগ দিতে তিন দিনের সফরে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ভারতে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একই সময়ে সাত বছর পর ভারতে আসছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ফলে ব্রিকস সম্মেলন ঘিরে ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের পাশাপাশি ভারত-চীন সম্পর্কেও নতুন সমীকরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নয়াদিল্লিতে মোদি-পুতিন বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ভারত ও রাশিয়ার কৌশলগত অংশীদারত্ব আরো জোরদার করাই ছিল বৈঠকের অন্যতম লক্ষ্য। বৈঠকের শুরুতে দুই নেতা উষ্ণ কোলাকুলি করেন। চলতি বছর এটি তাঁদের দ্বিতীয় বৈঠক। এর আগে গত ৩১ আগস্ট বিশকেকে অনুষ্ঠিত ২৬তম সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনের ফাঁকে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়েছিল।
বৈঠকের সময় পুতিনকে তামিল কবি ও দার্শনিক তিরুভাল্লুভারের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘তিরুক্কুরাল’-এর রুশ অনুবাদ উপহার দেন মোদি। কৃষি ও কৃষকদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে গ্রন্থটিতে।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার বাইরে কোনো ব্রিকস সম্মেলনে সশরীরে পুতিনের এটিই প্রথম অংশগ্রহণ। তাঁর সফরের আগে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেশকভ ভারতীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে মোদিকে অবহিত করবেন। প্রতিরক্ষা খাতকেন্দ্রিক চলমান ও ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলোও আলোচনার প্রধান বিষয় হবে বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
ভারতের সভাপতিত্বে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে দুই দিনব্যাপী ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এতে সদস্য দেশ ও আমন্ত্রিত প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আন্তসহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে মতবিনিময় করবেন বিশ্বনেতারা।
এদিকে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে সাত বছর পর ভারতে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সম্মেলনের ফাঁকে মোদির সঙ্গে তাঁর বৈঠক হতে পারে। সেখানে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য ঘাটতি এবং দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।
২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাদের সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধীরে ধীরে তার অবসানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। গত বছর মোদির চীন সফরের মাধ্যমে যে গতি তৈরি হয়েছিল, শির আসন্ন সফর সেই প্রক্রিয়াকে আরো এগিয়ে নেবে বলে দুই দেশের কর্মকর্তারা আশা করছেন।
চীনে ভারতের রাষ্ট্রদূত বিক্রম দোরাইস্বামী এক নিবন্ধে লিখেছেন, বিশ্বের দুই বৃহৎ উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে ভারত ও চীনের মধ্যে স্থিতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক শুধু দুই দেশের ২৮০ কোটি মানুষের স্বার্থেই নয়, এশিয়া ও বৃহত্তর বিশ্বের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই নেতা ভারত ও চীনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার’ এবং পরস্পরের উন্নয়নের জন্য ‘হুমকি নয়, সুযোগ’ হিসেবে দেখেন। চলতি মাসেই কিরগিজস্তানে একটি আঞ্চলিক ফোরামের ফাঁকে শি ও মোদীর সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ হয়েছিল।
এর আগে গত মাসে বেইজিংয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর মধ্যে বৈঠক হয়। সেখানে উভয় পক্ষই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতিপথে শীর্ষ নেতৃত্বের ধারাবাহিক বৈঠকের ইতিবাচক প্রভাবের কথা তুলে ধরেন।
তবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে সীমান্ত সমস্যা এখনো সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের অবস্থান, ভারত-চীন সম্পর্কের বৃহত্তর উন্নয়নের জন্য সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি। পূর্ব লাদাখে সামরিক অচলাবস্থা নিরসন এবং সেনা প্রত্যাহারের পর উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ পুনরায় শুরু করতে কাজানে একমত হয়েছিল দুই দেশ। সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সীমান্ত বিরোধের একটি ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজতে দুই নেতাই নিজ নিজ প্রতিনিধিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
বাণিজ্য ঘাটতিও মোদি-শি বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি ন্যায্য বাজার সুবিধা, সরবরাহব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ক্রমবর্ধমান ঘাটতি কমানোর বিষয়গুলো ভারতের এজেন্ডায় থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীন বর্তমানে ভারতের বৃহত্তম ব্যবসায়িক অংশীদার। ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ রেকর্ড ১৫ হাজার ১১০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতিও রেকর্ড ছুঁয়েছে। আগের ৯ হাজার ৯২১ কোটি ডলার থেকে বেড়ে এই ঘাটতি এখন ১১ হাজার ২১৬ কোটি ডলার।
ভারত গত বছর ব্রিকস সদস্য দেশগুলোকে ‘বাণিজ্য বৈষম্য’ দূর করার আহ্বান জানিয়েছিল। এই বৈষম্য কমাতে ভারতের জন্য বৃহত্তর বাজার সুবিধার বিষয়টিও এবার আলোচনায় থাকতে পারে।
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে এরই মধ্যে কিছু দৃশ্যমান অগ্রগতিও হয়েছে। গত বছর ভারত ও চীনের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল আবার শুরু হয়েছে। চীনা ব্যবসায়ীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়াও সহজ করেছে নয়াদিল্লি। দীর্ঘ ছয় বছর পর চলতি বছর ভারত-চীন সীমান্ত বাণিজ্যও পুনরায় শুরু হয়েছে। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এই বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
১৯৯২ সালে লিপুলেখ পাস দিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য শুরু হয়েছিল, যা ২০১৯ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। গত ১ আগস্ট চীনা কর্মকর্তারা ১৬ জন ব্যবসায়ী ও চারজন সহায়তাকারীকে পণ্য ছাড়াই তিব্বতে প্রবেশের অনুমতি দেন। এর মধ্য দিয়ে দুই পক্ষ সীমান্ত বাণিজ্য কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের সূচনা করে। এ ছাড়া ঐতিহাসিক সিল্ক রুটের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য করিডোর সিকিমের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নাথুলা পাস দিয়েও ছয় বছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তসীমান্ত বাণিজ্য শুরু হয়েছে।
সব মিলিয়ে ব্রিকস সম্মেলন শুধু উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর বহুপক্ষীয় সহযোগিতার মঞ্চই নয়, ভারতের জন্য রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন দিক নির্ধারণেরও গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি চীনের সঙ্গে সীমান্ত শান্তি, বাণিজ্য ভারসাম্য ও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ কতটা এগোয়, সেটিই এখন নজর রাখার বিষয়। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি স্বাভাবিকীকরণের প্রধান পরীক্ষা থাকবে সীমান্তের উত্তেজনা কমিয়ে আনা।
সানা/আপ্র/১১/৯/২০২৬