পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও সভ্যতার সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ইউফ্রেটিস নদীর উৎপত্তির দীর্ঘদিনের রহস্য অবশেষে উন্মোচন করেছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, পূর্ব অ্যানাতোলিয়ার ভয়াবহ টেকটোনিক বা ভূত্বকীয় আলোড়নের ফলে প্রায় ৩৬ লাখ থেকে ১৬ লাখ বছর আগে পৃথক দুটি নদীপ্রবাহ একত্রিত হয়ে আধুনিক ইউফ্রেটিস নদীর জন্ম নেয়।
ইউফ্রেটিস বা ফোরাত এবং এর সহোদর টাইগ্রিস বা দজলা নদীর মধ্যবর্তী উর্বর সমভূমি মানব সভ্যতার প্রাচীনতম কেন্দ্রগুলোর একটি। এখানেই গড়ে উঠেছিল প্রাচীন নগর উর, মারি ও ব্যাবিলনসহ ইতিহাসখ্যাত নগরসভ্যতা। গবেষকদের মতে, এই নদী ব্যবস্থার ইতিহাস জানা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর প্লাবনভূমিতেই কৃষি, নগরায়ণ ও লিখন পদ্ধতির মতো মানব সভ্যতার মৌলিক বিকাশ ঘটেছিল।
নতুন গবেষণায় সিসমিক ইমেজিং বা ভূকম্পন চিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ প্রাচীন নদীখাত শনাক্ত করা হয়। এই তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলের টরাস পর্বতমালার ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে দুটি পৃথক নদী ব্যবস্থা একত্রিত হয়ে একক শক্তিশালী নদীধারা তৈরি করে, যা পরবর্তীতে ইউফ্রেটিস নামে পরিচিত হয়।
দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার দীর্ঘতম নদী ইউফ্রেটিসের দৈর্ঘ্য প্রায় দুই হাজার আটশ কিলোমিটার। এটি তুরস্ক থেকে উৎপন্ন হয়ে সিরিয়া ও ইরাক হয়ে পারস্য উপসাগরে পতিত হয়েছে। এর তীরে গড়ে উঠেছে বিরেচিক, রাক্কা, রামাদি, ফালুজা ও নাসিরিয়াহসহ গুরুত্বপূর্ণ নগর ও জনপদ।
গবেষণায় আরো উঠে এসেছে, প্রায় ৫০ লাখ বছরেরও বেশি আগে ভূমধ্যসাগরের তলদেশে পানিশূন্যতার সময়কাল চলাকালে প্রাচীন নদীখাতসমূহ চাপা পড়ে যায়। পরবর্তীতে টেকটোনিক পরিবর্তনের ফলে নদীগুলোর প্রবাহপথ বদলে গিয়ে বর্তমান ইউফ্রেটিস নদীর কাঠামো তৈরি হয়।
গবেষকরা জানিয়েছেন, সমুদ্রতলের সিসমিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তারা এই নদী ব্যবস্থার বিবর্তন পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছেন। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ শিলা, বালি ও পলিস্তরের প্রতিফলন বিশ্লেষণ করে ত্রি-মাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা হয়, যা প্রাচীন নদীখাত শনাক্তে সহায়তা করে।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার ভূবিজ্ঞানী সাইমন ল্যাং জানান, এই প্রযুক্তি আল্ট্রাসাউন্ডের মতো কাজ করে, যার মাধ্যমে ভূগর্ভে চাপা পড়া স্তরসমূহের সূক্ষ্ম কাঠামো বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়। তার মতে, টেকটোনিক পরিবর্তনের ফলেই মুরাত ও কারাসু নদীর পূর্বসূরী ধারা একত্রিত হয়ে আধুনিক ইউফ্রেটিস গঠন করেছে।
গবেষণায় বলা হয়, প্রাচীন এই নদীগুলোর প্রবাহ বর্তমান নীল নদ কিংবা টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস ব্যবস্থার তুলনায় আরো শক্তিশালী ছিল। এই নদীপ্রবাহের পলি জমে মেসোপটেমিয়ার বিস্তীর্ণ সমভূমি গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে কৃষিভিত্তিক সমাজ ও নগররাষ্ট্রের জন্ম দেয়।
বিজ্ঞানীরা আরো উল্লেখ করেন, এই নদী ব্যবস্থার কারণেই কিউনিফর্ম লিখন পদ্ধতির মতো মানব ইতিহাসের প্রথম দিককার গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছিল। তাদের মতে, নদীর গতিপথ পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণ ছিল পূর্ব অ্যানাতোলিয়ার দীর্ঘস্থায়ী টেকটোনিক পরিবর্তন।
গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার জিওসায়েন্সে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ইউফ্রেটিসের মতো নদীর উৎপত্তি ও বিবর্তন বোঝা কেবল ভূতাত্ত্বিক গবেষণার জন্য নয়, বরং মানব সভ্যতার ইতিহাস অনুধাবনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১৫/৬/২০২৬