রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর জয় নিশ্চিত-এমন রাজনৈতিক বাস্তবতা জেনেও প্রার্থী দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, জয়-পরাজয় নয়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধারা ফিরিয়ে আনতেই তাঁরা প্রার্থী দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিএনপির ‘দ্বিচারিতা’ জনগণের সামনে তুলে ধরাও তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য।
সোমবার (১০ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রধান নির্বাচনি কর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের কার্যালয় থেকে জোটের প্রার্থী এলডিপি চেয়ারম্যান অলি আহমদের জন্য মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়। পরে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন হামিদুর রহমান আযাদ।
ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর জয় নিশ্চিত জেনেও কেন প্রার্থী দেওয়া হচ্ছে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখানে জয়-পরাজয় বিষয় নয়; আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটা সামনে নিয়ে আসছি।’
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মর্যাদার পদ রাষ্ট্রপতির নির্বাচনও যদি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হয়ে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের চর্চা হয় না। সুস্থ ধারার রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনতেই তাঁদের এ উদ্যোগ।
১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর এখন পর্যন্ত আটটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্যে সাতটিতেই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। কেবল ১৯৯১ সালে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীর মধ্যে ভোটাভুটি হয়েছিল। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলোর প্রার্থী বদরুদ্দোজা হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।
হামিদুর রহমান আযাদের মতে, ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাস্তব সম্ভাবনা ছিল। সে সময় বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় অন্য দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হলে ফল ভিন্ন হতে পারত।
তবে এবারের নির্বাচনকে ভিন্ন প্রেক্ষাপটের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিএনপি রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে যে দ্বিচারিতা করেছে, সেটা জাতির সামনে আনতে চাই।’
জামায়াতের এই নেতা অভিযোগ করেন, গণভোটের রায় বিএনপি বাস্তবায়ন করেনি। তাঁর দাবি, গণভোটের রায় বাস্তবায়িত হলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের বিষয়টি সামনে আসত এবং সংসদ সদস্যরা আরো স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেতেন।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হয়ে যায়। এ কারণে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ সীমিত-এমন সমালোচনা দীর্ঘদিনের।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সংসদ সদস্যদের স্বাধীন ভোটাধিকার নিশ্চিত হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রতিফলন ঘটত। তাঁর দাবি, সে সুযোগ থাকলে তাঁদের প্রার্থী অলি আহমদ ‘নিশ্চিতভাবে বিজয়ী’ হতেন।
অলি আহমদকে প্রার্থী করার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, অলি একজন বর্ষীয়ান নেতা ও খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারলে তাঁর মতো একজন ‘যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য’ প্রার্থী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হতে পারতেন বলে তিনি মনে করেন।
জামায়াত জোটের এই সমন্বয়ক আরো বলেন, রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের অধিকার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব বাধা দূর করতে তাঁরা সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন এবং সংসদের পাশাপাশি আন্দোলন-কর্মসূচির মাধ্যমেও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।
এর আগে রোববার ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অলি আহমদের নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ১৩ আগস্ট। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ১৬ আগস্ট। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট। আর ভোট গ্রহণ হবে ২০ আগস্ট।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরাই ভোটার। ফলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত-এমন রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যেই অলি আহমদকে প্রার্থী করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট।
সানা/আপ্র/১০/৮/২০২৬