গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

বিশ্ব পর্যটন দিবস

অপার সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক দুয়ার: এখন প্রয়োজন টেকসই পরিকল্পনা

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:২০ পিএম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২০:৫২ এএম ২০২৬
অপার সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক দুয়ার: এখন প্রয়োজন টেকসই পরিকল্পনা
ছবি

ছবি সংগৃহীত


নজরুল ইসলাম

বিশ্ব পর্যটন দিবস শুধু ভ্রমণের আনন্দ উদযাপনের দিন নয়; পর্যটনের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধির দিন। প্রতি বছর ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত হয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটনের গুরুত্ব কতটা বেড়েছে, তার একটি সাম্প্রতিক চিত্র পাওয়া যায় বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিল বলছে, (ডঞঞঈ) হিসাবে। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের অর্থনৈতিক অবদান ছিল ১১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ; একই সঙ্গে এ খাত ৩৬৬ মিলিয়ন কর্মসংস্থানকে সহায়তা করেছে।

বাংলাদেশও পর্যটনের ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় একটি দেশ। সমুদ্র, পাহাড়, বন, নদী, হাওর, চা-বাগান, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, লোকসংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রা—সবই আমাদের পর্যটনের সম্পদ। কক্সবাজারের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, সিলেটের চা-বাগান ও পাহাড়-ঝরনা এবং রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ ও পাহাড়ি সৌন্দর্য দেশের পর্যটন মানচিত্রকে সমৃদ্ধ করেছে। প্রশ্ন হলো—এই বিপুল সম্পদকে আমরা কতটা পরিকল্পিতভাবে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে পারছি?

বিশ্ব ব্যাংকের সাম্প্রতিক ডেটার দাবি, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের পর্যটন খাতের অবদান জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মোট কর্মসংস্থানের ৪ দশমিক ২ শতাংশের সমান ছিল। একই উৎসে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৯টি অর্থনীতির মধ্যে ১০৯তম। অর্থাৎ সম্ভাবনা থাকলেও অবকাঠামো, সেবা, যোগাযোগ, দক্ষতা ও পর্যটন-সহায়ক পরিবেশ উন্নয়নে আমাদের আরও অনেক পথপাড়ি দিতে হবে।

দেশীয় পর্যটনের শক্তি যে কতটা বড়, এর সাম্প্রতিক উদাহরণ কক্সবাজার। ২০২৫ সালের ঈদুল আজহার সাত দিনে সেখানে প্রায় ৮ লাখ পর্যটক এসেছিলেন বলে ব্যবসায়ী ও অংশীজনদের কথা গণমাধ্যমে উঠেছে । হোটেল-মোটেল-রিসোর্টের কক্ষও প্রায় পুরোপুরি বুক হয়ে গিয়েছিল। আবার ঈদুল ফিতরের সময় কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসায়ীরা ৭০০ কোটি টাকার বেশি ব্যবসার প্রত্যাশা করেছিলেন। এসব সংখ্যা সরকারি পূর্ণাঙ্গ পর্যটক গণনা নয়, বরং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের হিসাব; তবু এগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন বাজারের ব্যাপক চাহিদার একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। কক্সবাজারের এই চিত্রের বিপরীতে সুন্দরবন আমাদের সামনে আরেক ধরনের সম্ভাবনা হাজির করে—প্রকৃতিনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন। সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন বাড়ানো যেতে পারে, কিন্তু সেখানে অবাধ পর্যটন নয়; প্রয়োজন নির্ধারিত ধারণক্ষমতা, বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, প্লাস্টিকমুক্ত পরিবেশ, প্রশিক্ষিত গাইড এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার কঠোর ব্যবস্থা। প্রকৃতি ধ্বংস করে পর্যটন বাড়ানো হলে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর হবে।

সিলেটের অভিজ্ঞতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে বন্যা ও অস্থিরতার কারণে সিলেটের পর্যটন খাতে বড় ধরনের ক্ষতির কথা স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। এক প্রতিবেদনে ক্ষতির পরিমাণ ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত বলে সিলেটের ব্যবসায়ী মহলের বরাত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, পর্যটন শুধু আকর্ষণীয় স্থান তৈরি করলেই হয় না; জলবায়ু ঝুঁকি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ ও নিরাপত্তাকেও পর্যটন পরিকল্পনার অংশ করতে হয়।

রাঙামাটির চিত্র আবার সম্ভাবনার অন্য দিকটি দেখায়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এক সপ্তাহান্তে প্রায় ৬ হাজার পর্যটক রাঙামাটি ভ্রমণ করেছিলেন এবং শুধু সাজেকেই দুই দিনে প্রায় ৪ হাজার পর্যটকের আগমনের কথা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছিলেন। ২০২৬ সালের শুরুতেও শীত মৌসুমে রাঙামাটির হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলো প্রায় পূর্ণ থাকার খবর এসেছে। অর্থাৎ পাহাড়-হ্রদভিত্তিক পর্যটনেরও বড় বাজার রয়েছে। তবে পাহাড়ি অঞ্চলে নিরাপত্তা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার, পরিবেশ এবং সংস্কৃতির প্রতি সংবেদনশীলতা বজায় রেখেই পর্যটন সম্প্রসারণ করতে হবে।

বাংলাদেশের পর্যটনের আরেকটি বড় সম্ভাবনা বিদেশি পর্যটক। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্যভিত্তিক সরকারি প্ল্যাটফর্মে পর্যটক আগমন, ট্যুর গাইড, ট্যুর অপারেটর, পর্যটন আবাসন, পরিবহন ও কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজমের তথ্য ও সেবা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ উদ্যোগগুলোকে আরো কার্যকর ও তথ্যনির্ভর করতে হবে। একই সঙ্গে ডাবলিউটিটিসির হিসাবে দাবি- ২০২৪ সালে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ব্যয় আনুমানিক ৪৪ বিলিয়ন টাকা এবং দেশীয় পর্যটকদের ব্যয় প্রায় ৯১০ দশমিক ৭ বিলিয়ন টাকা হতে পারে- এগুলো ছিল ওই বছরের অনুমান।

পর্যটনকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিনোদন খাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, হস্তশিল্প, কৃষি, সংস্কৃতি ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরি, সহজ যাতায়াত, নিরাপদ পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা, ডিজিটাল প্রচার, মানসম্মত আবাসন ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য সহজতর সেবা নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যটন উন্নয়ন হতে হবে টেকসই। কক্সবাজারে সমুদ্র ও সৈকত, সুন্দরবনে বন ও বন্যপ্রাণী, সিলেটে পাহাড়-ঝরনা-হাওর এবং রাঙামাটিতে পাহাড়-হ্রদ ও স্থানীয় সংস্কৃতি- কোনোটিই অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের চাপে নষ্ট করা যাবে না। স্থানীয় মানুষকে পর্যটনের অংশীদার করতে হবে- যাতে পর্যটকের ব্যয় স্থানীয় অর্থনীতিতে ফিরে আসে।

বিশ্ব পর্যটন দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—শুধু পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং পর্যটনের মান বাড়ানো। বাংলাদেশের প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে সুরক্ষিত রেখে পরিকল্পিত বিনিয়োগ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে আগামীতেপর্যটন হয়ে উঠতে পারে কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির শক্তিশালী চালিকাশক্তি। প্রকৃতি আমাদের পরমবন্ধু ও সম্পদ; এর সঠিক ব্যবস্থাপনায় পর্যটন সেই সম্পদকে টেকসই সমৃদ্ধিতে রূপ দিতে পারে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও সমাজচিন্তক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/২৫.০৯.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

পরীক্ষাভিত্তিক রোল নম্বর কি শিশুদের শেখাকে আনন্দদায়ক করে?
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরীক্ষাভিত্তিক রোল নম্বর কি শিশুদের শেখাকে আনন্দদায়ক করে?

ড. রউফুল আলমপ্রাথমিক শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো, শিশুদের শেখার আনন্দ ধরিয়ে দেওয়া, নিজেদ...

জবাবদিহি ও জনকল্যাণে সরকারের নতুন রাষ্ট্রচিন্তা
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জবাবদিহি ও জনকল্যাণে সরকারের নতুন রাষ্ট্রচিন্তা

আহসান হাবিব বরুনরাষ্ট্র পরিচালনার চিরাচরিত ধারায় যখন কর্তৃত্ববাদ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার শেকল ভেঙে স...

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট লীলা
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট লীলা

১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনগুলো ছিল অনেকটাই পুরুষকেন্দ্রিক। শিক্ষার্থীর স...

পর্যটন: সেকাল, একাল এবং ভবিষৎকাল
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পর্যটন: সেকাল, একাল এবং ভবিষৎকাল

মাহবুব রুমনঅজানাকে জয় করার অদম্য ইচ্ছা থেকেই মানুষ আদিম যুগ থেকে আজকের এই এআই যুগে উপনীত হয়েছে। অজান...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বাস ভাড়া বাড়লো কিলোমিটারে ১৭ পয়সা, প্রজ্ঞাপনের আগেই বাড়তি আদায়

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির আগেই রাজধানীসহ বিভিন্ন রুটে বাসভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন পরিবহনকর্মীদের কেউ কেউ। কোথাও ১০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা, কোথাও প্রতি স্টপেজে পাঁচ টাকা করে বেশি নেওয়া হচ্ছে। দূরপাল্লার বাসেও গন্তব্যভেদে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অথচ সরকার ও সড়ক পরিবহন মালিকপক্ষ প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন বাস ভাড়ার এই নৈরাজ্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?

মোট ভোট: ০ | শেষ আপডেট: 2 দিন আগে