খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যস্ততার ফাঁকে কাগজের ছোট ছোট চিরকুটে লিখতেন কবিতা। সেই শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম, ক্লান্তি, স্বপ্ন আর প্রতিদিনের লড়াই নিয়েই গড়ে ওঠে তাঁর কাব্যের জগৎ। আর সেই কবিতাই এবার চীনের ডেলিভারি রাইডার ওয়াং জিবিংকে এনে দিয়েছে দেশটির অন্যতম সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান ‘লু শুন সাহিত্য পুরস্কার’।
ডেলিভারি রাইডারদের দৈনন্দিন জীবন, অনিশ্চয়তা ও সংগ্রামকে উপজীব্য করে লেখা তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘লো ফ্লাইট’ এ বছরের এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। আধুনিক চীনা সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ লু শুনের নামে প্রবর্তিত এ পুরস্কার দেশটির সাহিত্য অঙ্গনের সর্বোচ্চ স্বীকৃতিগুলোর একটি।
বর্তমানে ৫৬ বছর বয়সী ওয়াং জিবিং ২০১৯ সালে জীবিকার তাগিদে খাবার সরবরাহের কাজ শুরু করেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে লেখা তাঁর কবিতা ও গদ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পাঠকের নজরে আসেন তিনি। ধীরে ধীরে শ্রমজীবী মানুষের জীবনকথা তুলে ধরা একজন শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।
১৫ জুলাই পুরস্কারজয়ের খবর ঘোষণার পর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় ওয়াং বলেন, ‘আমি দম বন্ধ করে অপেক্ষা করছিলাম। ভীষণ নার্ভাস ছিলাম। ফল ঘোষণার পর যেন সব চাপ এক মুহূর্তে দূর হয়ে গেল।’ তবে হঠাৎ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসায় মানসিক চাপও অনুভব করেছেন বলে জানান তিনি।
জিয়াংসু প্রদেশে জন্ম নেওয়া ওয়াংয়ের শৈশব কেটেছে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে কৈশোরেই লেখাপড়া ছেড়ে দিতে হয়। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি নির্মাণশ্রমিক, আবর্জনা সংগ্রহকারী এবং পথের ধারে ছোট ব্যবসায়ী হিসেবেও কাজ করেছেন। তবু বই পড়া ও লেখালেখির প্রতি তাঁর ভালোবাসা কখনো কমেনি।
২০২২ সালে ‘ম্যান ইন আ হারি’ শিরোনামের একটি কবিতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ভুল ঠিকানা দেওয়া এক গ্রাহকের কারণে ডেলিভারির সময় যে ভোগান্তির শিকার হয়েছিলেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই কবিতাটি লিখেছিলেন তিনি।
পরের বছর প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ম্যান ইন আ হারি: ফুড ডেলিভারি রাইডারের কবিতা’। আর ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘লো ফ্লাইট’ গ্রন্থটি তাঁকে এনে দেয় দেশের সর্বোচ্চ সাহিত্যিক স্বীকৃতি। প্রায় ২০০ জন ডেলিভারি রাইডারের অভিজ্ঞতা ও সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে রচিত এই কাব্যগ্রন্থে শ্রমজীবী মানুষের অদেখা বাস্তবতা উঠে এসেছে গভীর মানবিকতায়।
গ্রন্থটির বহুল আলোচিত একটি পঙ্ক্তি— ‘কে বলেছে ডানা মেলা মানেই শুধু আকাশের অনেক ওপরে উড়া? নিচুতে উড়াও তো উড়াই।’
পুরস্কার পেলেও নিজের পেশা ছাড়ার কোনো ইচ্ছা নেই ওয়াংয়ের। তিনি জানিয়েছেন, অন্তত ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত ডেলিভারি রাইডার হিসেবেই কাজ করতে চান।
তাঁর ভাষায়, ‘জীবিকা নির্বাহের জন্য এখন আর এই কাজের প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমি এই কাজের পরিবেশ ভালোবাসি। এটি আমাকে শারীরিকভাবে সুস্থ রাখে। আমি সাধারণ মানুষের মতোই জীবন কাটাতে চাই। এই পুরস্কার আমার পরিচয় বদলে দেবে না।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনে শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতা সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করছে। সাবেক কুরিয়ার কর্মী হু আনিয়ানের স্মৃতিকথা এবং অভিবাসী শ্রমিক ফ্যান ইউসুর আত্মজীবনীমূলক লেখার পর ওয়াং জিবিংয়ের এই অর্জন সেই ধারাকেই আরও শক্তিশালী করেছে। তাঁর সাফল্য প্রমাণ করেছে, জীবনের কঠিন বাস্তবতা থেকেও জন্ম নিতে পারে অসাধারণ সাহিত্য; আর সৃষ্টিশীলতার জন্য পেশা নয়, প্রয়োজন গভীর অনুভব ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম মমত্ব।
সানা/আপ্র/২১/৭/২০২৬