একেএম ফজলুল হক: চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের ধস নেমেছে। এ বছর বোর্ডে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠানের পাসের হার শূন্য শতাংশ।
বোর্ডের ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই ১৫ বছরে কোনো বছরই পাসের হার ৭৫ শতাংশের নিচে নামেনি। ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ। সেই তুলনায় চলতি বছর পাসের হার কমেছে ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশীয় পয়েন্ট।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী ফলাফল বিপর্যয়ের পেছনে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য, পড়াশোনার বাইরে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনমুখী হয়ে পড়ার প্রভাব ফলাফলেও পড়েছে।
এবার বোর্ডে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫২ হাজার ৭৫৬ জন অকৃতকার্য হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ হাজার ৭৭১ জন শুধু একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, যা মোট পরীক্ষার্থীর ২২ দশমিক ০৯ শতাংশ।
কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। এবার ৯ হাজার ৩৯৮ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৮৪৩ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ কমেছে ২ হাজার ৪৪৫টি।
১৫ বছরের ফলাফলে নজিরবিহীন পতন
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১১ সালে পাসের হার ছিল ৭৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ২০১২ সালে ৭৯ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৮৮ দশমিক ০৭ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৯১ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং ২০১৫ সালে ৮২ দশমিক ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে।
২০১৬ সালে পাসের হার ছিল ৯০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ২০১৭ সালে ৮৪ দশমিক ১৩ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৭৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৭৮ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং ২০২০ সালে ৮৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে।
২০২১ সালে বোর্ডের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৯১ দশমিক ১৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে। এরপর ২০২২ সালে পাসের হার ছিল ৮৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৮২ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ। আর এবার তা আরো কমে নেমেছে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে।
জিপিএ-৫-এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের পতন দেখা গেছে। ২০২২ সালে ১৮ হাজার ৬৬৪ জন, ২০২৩ সালে ১১ হাজার ৪৫০ জন, ২০২৪ সালে ১০ হাজার ৮২৩ জন এবং ২০২৫ সালে ১১ হাজার ৮৪৩ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল। এবার সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৯ হাজার ৩৯৮ জনে।
শূন্য পাস আট প্রতিষ্ঠানে
এবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ‘শূন্য শতাংশ পাস’ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই এসএসসিতে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ফটিকছড়ির নারায়ণহাট গার্লস হাইস্কুল থেকে তিনজন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে কেউ পাস করেনি। রাঙামাটির বরকল উপজেলার আন্দর মানিক (মাইছছড়ি) জুনিয়র হাইস্কুলে পরীক্ষার্থী ছিল ১০ জন এবং লংগদুর মোহালছড়ি হাইস্কুলে ১৫ জন। এই দুটি প্রতিষ্ঠান থেকেও কেউ উত্তীর্ণ হয়নি।
সন্দ্বীপের উরিরচর জুনিয়র হাইস্কুল থেকে ১০ জন, খাগড়াছড়ির ভাইবোনছড়া গার্লস হাইস্কুল থেকে ১৭ জন এবং দীঘিনালার জারুলছড়ি হেডম্যান পাড়া হাইস্কুল থেকে ১৯ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।
এ ছাড়া দীঘিনালার তারাবানিয়া হাইস্কুল ও বাঘাইছড়ির শিলজাক দজার বাজার জুনিয়র স্কুল থেকে পাঁচজন করে পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়নি।
শূন্য পাসের আট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী ছিল জারুলছড়ি হেডম্যান পাড়া হাইস্কুলে-১৯ জন। এরপর ভাইবোনছড়া গার্লস হাইস্কুলে ১৭ জন এবং মোহালছড়ি হাইস্কুলে ১৫ জন পরীক্ষার্থী ছিল।
দুর্গম এলাকার শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, ইংরেজি ও গণিতসহ কয়েকটি বিষয়ে পাসের হার কমে যাওয়া এবং পাহাড়ি ও গ্রামীণ এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আশানুরূপ ফল না করায় সামগ্রিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এবারের পরীক্ষায় তুলনামূলক কড়াকড়িও ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হতে পারে বলে তাদের ধারণা।
তবে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের দুর্বলতাকে দায়ী করা যথাযথ নয় বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। শিক্ষক সংকট, নিয়মিত পাঠদান, দুর্গম এলাকায় শিক্ষার সুযোগ, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, অভিভাবকদের আর্থিক সক্ষমতা, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো এবং শিক্ষা প্রশাসনের তদারকির মতো বিষয়ও এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, ফলাফল বিশ্লেষণ করে কোন কোন প্রতিষ্ঠান ও বিষয়ে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়েছে, তা চিহ্নিত করা হবে। শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোর ফল খারাপ হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় একাডেমিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সানা/আপ্র/১০/৮/২০২৬