জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবেলায় চারটি জরুরি বৈশ্বিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গতভাবে কমানো, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা, জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার সুযোগ বাড়ানো এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সম্মেলন কক্ষ-৪-এ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবেলায় আয়োজিত উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে তিনি এসব আহ্বান জানান। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের অংশ হিসেবে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্র দ্রুত এগিয়ে আসছে, তাই বৈশ্বিক উদ্যোগকেও আরো দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো দেশ যেন একা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো একা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পরিণতি মোকাবেলা করতে পারবে না। এ জন্য বৈশ্বিক সহায়তা ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তিনি বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ আরো দ্রুত, ব্যাপক ও ন্যায়সঙ্গতভাবে কমানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার লক্ষ্য ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
দ্বিতীয়ত, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর উপকূলীয় অভিযোজন কার্যক্রমে পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
তৃতীয় পদক্ষেপ হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি, তথ্য-উপাত্ত ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার সুযোগ সম্প্রসারণের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
চতুর্থত, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরো জোরদারের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন ও জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলেন।
বাংলাদেশের ঝুঁকি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ। শত শত নদী এ দেশের ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সাগরে মিশেছে এবং দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকা পানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে দেশের সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ উপকূলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৫ সেন্টিমিটার বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় ৪ শতাংশ ভূমি পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এতে প্রায় ১ কোটি মানুষের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও মানবিক মর্যাদা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, সীমিত সম্পদ নিয়েও দেশটি এমন বিপর্যয়কর ভবিষ্যৎ ঠেকাতে কাজ করছে। আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় প্রস্তুতি জোরদার এবং উপকূল রক্ষায় বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পানি সংরক্ষণ ও মজুদের জন্য পদ্মা ব্যারেজ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া, মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে তিস্তা ব্যারেজ আধুনিকায়ন এবং ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে সবুজ প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, যেখানে সৌরবিদ্যুতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু অভিযোজনমূলক পদক্ষেপ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবেলায় যথেষ্ট নয়। বিশ্ব যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করছে, সমুদ্র তার প্রতিটি টনের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। তাই কার্বন নিঃসরণ কমাতে ভোগের ধরন নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।
বৈঠক শেষে তিনি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়ে ঘোষণাপত্রে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান।
সানা/আপ্র/২৫/৯/২০২৬