সুখদেব কুমার সানা
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু এখন কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ। অনেকে আশঙ্কা করছেন, জেনারেটিভ এআই মানুষের কাজ কেড়ে নেবে এবং বিপুলসংখ্যক কর্মী বেকার হয়ে পড়বেন। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের ‘বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২৪: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা’ বিষয়টিকে আরো ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নত দেশগুলোতে প্রায় ১৪ দশমিক ২ শতাংশ চাকরি এআইয়ের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে- যেখানে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই ঝুঁকি মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর প্রায় ১৬ দশমিক ২ শতাংশ কর্মসংস্থানে এআই উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের মতো দেশের সামনে এআই একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বাস্তবতা বিবেচনায় এই বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শ্রমবাজার এখনো তৈরি পোশাক, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, নির্মাণ এবং বিভিন্ন সেবাখাতনির্ভর। এসব খাতে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাপক কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। বরং সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, অপচয় কমানো, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সুযোগ অনেক বেশি।
উদাহরণ হিসেবে কৃষিতে আবহাওয়া, মাটির গুণাগুণ ও রোগবালাই বিশ্লেষণে এআই কৃষকের সিদ্ধান্তকে আরো কার্যকর করতে পারে। স্বাস্থ্যখাতে প্রাথমিক রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা তথ্য বিশ্লেষণ এবং দূরবর্তী অঞ্চলে পরামর্শসেবা সম্প্রসারণে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর শেখার গতি ও দুর্বলতা অনুযায়ী ব্যক্তিকেন্দ্রিক পাঠদানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কর প্রশাসন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও এআইভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ দক্ষতা বাড়াতে সক্ষম। তবে প্রযুক্তির সম্ভাবনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবতায় রূপ নেয় না। এর জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি।
বাংলাদেশের এখন জরুরি ভিত্তিতে একটি সমন্বিত জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন- যা শুধু তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং শিক্ষা, শ্রমবাজার, শিল্পনীতি, প্রশাসনিক সংস্কার, তথ্য সুরক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সমন্বিত হবে। বিশ্বব্যাংক তিন ধাপের একটি কৌশলের কথা বলেছে- বিদ্যমান প্রযুক্তি গ্রহণ, স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী তা অভিযোজিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলা। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় প্রথম দুই ধাপই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের এখনই ব্যয়বহুল তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের প্রতিযোগিতায় নামার প্রয়োজন নেই; বরং বাংলা ভাষাভিত্তিক কার্যকর এআই সরঞ্জাম, কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবা সহায়ক অ্যাপ্লিকেশন, শিক্ষা সহায়ক প্ল্যাটফর্ম এবং সরকারি সেবায় তথ্য বিশ্লেষণ সক্ষমতা গড়ে তোলাই অধিক বাস্তবসম্মত পথ। বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে বাংলা ভাষার ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরিতে। বিশ্বব্যাপী অধিকাংশ এআই প্রযুক্তি ইংরেজিকেন্দ্রিক হওয়ায় বাংলা ভাষার প্রশাসনিক নথি, কৃষি নির্দেশিকা, স্বাস্থ্যসেবা উপকরণ, আইনগত তথ্য এবং শিক্ষাসামগ্রী মানসম্মত ডিজিটাল রূপে সংরক্ষণ করা জরুরি। এটি না হলে প্রযুক্তির সুফল কেবল শহুরে শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং ডিজিটাল বৈষম্য আরো বাড়বে।
কর্মসন্ধানী তরুণদের জন্য এ বাস্তবতার সবচেয়ে বড় বার্তা হলো-শুধু প্রথাগত ডিগ্রি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না। তথ্য বিশ্লেষণ, ডিজিটাল যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা এবং এআই-সহায়ক সফটওয়্যার ব্যবহারের দক্ষতা এখন মৌলিক কর্মদক্ষতার অংশ। প্রোগ্রামার না হলেও এআই টুল ব্যবহার করে লেখা, গবেষণা, হিসাব, বিপণন, গ্রাহকসেবা বা প্রশাসনিক কাজ দক্ষভাবে পরিচালনা শেখা প্রয়োজন।
বর্তমান কর্মজীবীদের জন্যও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে ‘একবার শিখে সারাজীবন কাজ’ করার ধারণা দ্রুত অচল হয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত পুনঃপ্রশিক্ষণ, অনলাইন কোর্স, শিল্পভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন এখন পেশাগতভাবে টিকে থাকার পূর্বশর্ত। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে ব্যবহারিক এআই প্রশিক্ষণ দ্রুত চালু করা উচিত। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে নৈতিকতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, ভুয়া তথ্যের বিস্তার, অ্যালগরিদমিক বৈষম্য এবং স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা গেলে প্রযুক্তির প্রতি সামাজিক আস্থা নষ্ট হবে। তাই তথ্য সুরক্ষা আইন, স্বচ্ছ ব্যবহারবিধি, স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা এবং মানবিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। তাই বাংলাদেশের সামনে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ উপস্থিত।
প্রস্তুতি নিলে এআই হতে পারে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের শক্তিশালী হাতিয়ার; আর প্রস্তুতি না নিলে এটি বৈষম্য, দক্ষতার ঘাটতি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই এআইকে ভয় পাওয়ার সময় এখন নয়; বরং দূরদর্শী নীতি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যতের অর্থনীতি তথা সামগ্রিক উন্নয়নে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার সময় এখনই।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আজকের প্রত্যাশা
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/০৮.০৮.২০২৬