জুলাই আন্দোলনের সময় টেলিভিশন সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাবেক আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতের কথোপকথনের একটি অডিও ফোনালাপ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
সোমবার (১০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ আওয়ামী লীগের সাত নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যুক্তিতর্কের চতুর্থ দিনে তিন মিনিট ২৭ সেকেন্ডের ওই অডিও রেকর্ড উপস্থাপন করা হয়। প্রসিকিউশনের দাবি, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই দুপুর ২টার দিকে কাদের ও আরাফাতের মধ্যে ওই কথোপকথন হয়।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে অডিওটি উপস্থাপন করে বক্তব্য দেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। এ সময় প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, সুলতান মাহমুদ ও সহিদুল ইসলাম সরদার উপস্থিত ছিলেন।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোনালাপে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে আন্দোলনের সময় সংঘাত বা মারামারির দৃশ্য সম্প্রচার না করার বিষয়ে আলোচনা করেন কাদের ও আরাফাত। একপর্যায়ে কাদের বলেন, যারা কথা শুনছে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জবাবে আরাফাত দাবি করেন, তিনি এরই মধ্যে কয়েকটি চ্যানেল বন্ধ করেছেন এবং অন্যদেরও সতর্ক করেছেন। সংঘাত বা মারামারির ভিডিও সম্প্রচার করা হলে সংশ্লিষ্ট টেলিভিশনকে ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ ঘোষণা করে আজীবনের জন্য বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার কথাও ফোনালাপে শোনা যায় বলে প্রসিকিউশন জানিয়েছে।
এ সময় আরাফাত টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার পর্যবেক্ষণের জন্য বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেন। কোনো চ্যানেলে সংঘাতের দৃশ্য দেখা গেলে তাৎক্ষণিকভাবে সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথা তিনি কাদেরকে জানান।
ফোনালাপে জুলাই আন্দোলনকারীদের নিয়েও আলোচনা হয়। পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে আরাফাত দাবি করেন, কোটা আন্দোলনকারীরা দুই ভাগে বিভক্ত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একদল কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, যাদের সঙ্গে সরকার আলোচনা করছে; অন্যদিকে ‘তৃতীয় পক্ষ’ হিসেবে জামায়াত-বিএনপির লোকজন সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগ করছে। প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত বর্ণনা অনুযায়ী, কাদের ওই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।
কথোপকথনের শেষদিকে আরাফাত জানান, তিনি গণভবনে এসে পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কাদেরও তাঁকে চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন এবং আহত দলীয় নেতাকর্মীদের চিকিৎসার বিষয়ে কথা হয়।
এর আগে কাদেরের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আরেকটি ফোনালাপও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছিল। প্রসিকিউশনের দাবি, ওই কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হামলার জন্য কাদেরকে উসকানি দিতে শোনা যায়।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে আসামিরা সমন্বিতভাবে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। একই সঙ্গে কোথাও কোথাও সশস্ত্র হামলা, দমন-পীড়ন ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে তাঁদের ভূমিকা ছিল। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দেশজুড়ে হত্যা ও ব্যাপক সহিংসতা ঘটে বলে প্রসিকিউশনের অভিযোগ।
এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৮ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। গত ৪ আগস্ট থেকে ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।
ওবায়দুল কাদের ছাড়া এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। তাঁদের সবাই পলাতক রয়েছেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সানা/আপ্র/১০/৮/২০২৬