গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

মেনু

গাইড বইয়ের ছায়ায় হারিয়ে যাচ্ছে পাঠ্যবই

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৫৬ পিএম, ০৯ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২১:৪১ এএম ২০২৬
গাইড বইয়ের ছায়ায় হারিয়ে যাচ্ছে পাঠ্যবই
ছবি

ছবি সংগৃহীত

নজরুল ইসলাম

শিক্ষা কি শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার নাম? নাকি শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিয়ে ভাবতে এবং সত্য অনুসন্ধান করতে শেখায়? বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে গাইড বইয়ের ওপর শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার প্রবণতা সামনে এলে এই মৌলিক প্রশ্নগুলো নতুন করে ভাবতে হয়। কারণ গাইড বইয়ের বিস্তার নিছক একটি প্রকাশনা-বাণিজ্যের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দর্শন, পরীক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষকতার মান, অভিভাবকদের প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাশক্তির প্রশ্ন।

এক সময় শিক্ষার্থীর জ্ঞানের প্রধান দরজা ছিল পাঠ্যবই, শিক্ষক ও গ্রন্থাগার। একটি বই বারবার পড়ে তার অন্তর্নিহিত ভাব বোঝা, শিক্ষকের কাছে প্রশ্ন করা, নিজের ভাষায় উত্তর লেখা এবং অতিরিক্ত বই পড়ে জ্ঞানকে বিস্তৃত করা ছিল শিক্ষার স্বাভাবিক অনুশীলন। সময়ের পরিবর্তনে সেই জায়গায় এসেছে গাইড, নোট, সাজেশন এবং পরীক্ষামুখী প্রস্তুতির নানা উপকরণ। সহায়ক বই থাকা অপরাধ নয়; কিন্তু যখন সহায়ক বই মূল পাঠ্যবইকে ছাপিয়ে যায়, তখনই বিপদের ঘণ্টা বেজে ওঠে।

বাংলাদেশে একটি গণমুখী, সর্বজনীন ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার যে নির্দেশনা রয়েছে- এর মর্ম কেবল বিদ্যালয়ে ভর্তি বাড়ানো বা পরীক্ষার ফল উন্নত করা নয়। শিক্ষার লক্ষ্য মানুষের মননশীলতা ও মানবিক বিকাশের পথ উন্মুক্ত করা। অথচ গাইডনির্ভর শিক্ষা অনেক সময় শিক্ষার্থীকে শেখায়—প্রশ্নের উত্তর কোথায় পাওয়া যাবে; কিন্তু শেখায় না—কীভাবে একটি প্রশ্নের উত্তর নিজে খুঁজে বের করতে হয়। এখানেই সমস্যাটির গভীরতা।

গাইড বইয়ের প্রস্তুত উত্তর শিক্ষার্থীর চিন্তার শ্রমকে কমিয়ে দেয়। পরীক্ষায় কোন প্রশ্ন আসতে পারে, তার সম্ভাব্য উত্তর কী, কত লাইন লিখলে ভালো নম্বর পাওয়া যাবে- এসবই হয়ে ওঠে প্রস্তুতির কেন্দ্রবিন্দু। ফলে শিক্ষা ক্রমে জ্ঞানচর্চা থেকে পরীক্ষাচর্চায় পরিণত হয়। শিক্ষার্থী জানে ‘কী লিখতে হবে’, কিন্তু অনেক সময় জানে না ‘কেন লিখতে হবে’। মুখস্থ উত্তর পরীক্ষার খাতা পূর্ণ করতে পারে, কিন্তু তা সবসময় মননকে সমৃদ্ধ করে না। এই প্রবণতার পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী করা অন্যায়। এ জন্য আমাদের পরীক্ষা ব্যবস্থাও অনেকাংশে দায়ী।

যেখানে ফলাফলই সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি, সেখানে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক উভয়েই দ্রুত ফল পাওয়ার পথ খুঁজবেন—এটাই স্বাভাবিক। বিদ্যালয়ে সৃজনশীল শিক্ষার পরিবেশ দুর্বল হলে, শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত আলোচনা না হলে এবং মূল্যায়নে মুখস্থনির্ভরতার সুযোগ থাকলে গাইড বইয়ের বাজার আরও বিস্তৃত হবে।

অভিভাবকদের মানসিকতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের ভালো ফল প্রত্যাশা স্বাভাবিক। কিন্তু ভালো ফলের জন্য যদি তাকে একের পর এক গাইড বই মুখস্থ করানো হয়, তাহলে হয়তো নম্বর বাড়বে। কিন্তু স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা কি বাড়বে? আজকের পৃথিবীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি ও তথ্যের বিস্ফোরণের যুগে তথ্য মুখস্থ রাখার চেয়ে তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ ও প্রয়োগ করার ক্ষমতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ওই পৃথিবীর জন্য আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে হলে তাদের গাইডের নির্ভরশীল পাঠক নয়, স্বাধীন চিন্তার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন আদর্শ শিক্ষক শুধু বইয়ের অধ্যায় শেষ করেন না। তিনি শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রশ্ন জাগিয়ে দেন।

একটি অঙ্কের একাধিক সমাধান, একটি ইতিহাসের ঘটনার নানা দৃষ্টিভঙ্গি, একটি সাহিত্যকর্মের অন্তর্নিহিত জীবনবোধ কিংবা একটি বৈজ্ঞানিক সূত্রের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা যত বাড়বে; গাইডনির্ভরতা তত কমবে। বিদ্যালয়কে পরীক্ষার প্রস্তুতিকেন্দ্র নয়, চিন্তার কর্মশালা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজন পরীক্ষা পদ্ধতিরও সংস্কার। এমন প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হবে- যেখানে প্রস্তুত উত্তর হুবহু লিখে পূর্ণ নম্বর পাওয়ার সুযোগ কম থাকবে। বিশ্লেষণ, যুক্তি, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান ও বাস্তব প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব বৃদ্ধি তরতে হবে। এর পাশাপাশি পাঠ্যবইকে আরো আকর্ষণীয়, সহজবোধ্য ও জীবনঘনিষ্ঠ করতে হবে।

পাঠ্যবই যদি শিক্ষার্থীর কৌতূহল জাগাতে পারে, তাহলে গাইড বইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রয়োজন অনেকটাই কমে আসবে। রাষ্ট্রেরও এখানে দায়িত্ব আছে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, নিম্নমানের সহায়ক বই এবং পরীক্ষাভিত্তিক বাজারব্যবস্থার ওপর কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। তবে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মূল শিক্ষাব্যবস্থাকেই এমন শক্তিশালী করতে হবে, যাতে গাইড বই সহায়ক হিসেবে থাকে, অপরিহার্য হিসেবে নয়।

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় তার শ্রেণিকক্ষে। আমরা যদি এমন প্রজন্ম চাই, যারা প্রশ্ন করবে, যুক্তি দেবে, ভুল থেকে শিখবে এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করবে, তাহলে তাদের হাতে শুধু প্রস্তুত উত্তর তুলে দিলে চলবে না। তাদের হাতে দিতে হবে পাঠ্যবই, জ্ঞানের স্বাধীনতা এবং চিন্তার সাহস।

গাইড বইয়ের ছায়া যেন পাঠ্যবইকে গ্রাস না করে। কারণ শিক্ষা যদি শুধু পরীক্ষার খাতায় নম্বর তোলার কৌশলে সীমাবদ্ধ হয়, তবে আমরা পরীক্ষার্থী তৈরি করব; কিন্তু জ্ঞানী, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করতে পারব না। আর রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য কতজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলো, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—কতজন মানুষ সত্যিকার অর্থে চিন্তা করতে শিখল।

লেখক: গণমাধ্যম ও সমাজকর্মী
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/০৯.০৮.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই
০৯ আগস্ট ২০২৬

ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস

এআই বাস্তবতায় দক্ষতাই হবে মূল শক্তি
০৮ আগস্ট ২০২৬

এআই বাস্তবতায় দক্ষতাই হবে মূল শক্তি

সুখদেব কুমার সানাএআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু এখন কর্মসংস...

জাতীয় ট্র্যাজেডি সড়কে মৃত্যুর মিছিলেও সব সেক্টর নির্বিকার
০৮ আগস্ট ২০২৬

জাতীয় ট্র্যাজেডি সড়কে মৃত্যুর মিছিলেও সব সেক্টর নির্বিকার

খান মুহঃ আশরাফুল আলমসকালবেলা ঘুম থেকে জেগে খবরের কাগজ হাতে নিলে কিংবা মুঠোফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখলে য...

মুখ-মাড়ি-গলায় নীরবে আঘাত হানে সিগারেটের ধোঁয়া
০৬ আগস্ট ২০২৬

মুখ-মাড়ি-গলায় নীরবে আঘাত হানে সিগারেটের ধোঁয়া

স্বাস্থ্য প্রতিদিন===

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

শেখ হাসিনার বক্তব্য সমর্থন করে না ভারত, জানালেন জয়সওয়াল

বাংলাদেশের বর্তমান বৈধ ও গঠিত সরকারের বিষয়ে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্য সমর্থন করে না নয়াদিল্লি। শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “এই অনুষ্ঠান সম্পর্কে আমাদের অবস্থান আগেই স্পষ্ট করা হয়েছে। আমি আবারো সেটিই বলছি। এটি একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যম আয়োজিত অনুষ্ঠান ছিল, যেখানে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না।” প্রিয় পাঠক. আপনি কি মনে করেন ভারত সঠিক বলেছে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে