মঙ্গলে অভিযানের প্রস্তুতির জন্য পৃথিবীতে তৈরি করা পরীক্ষামূলক রোভার এবার চাঁদের বুকে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। ‘প্রমিস’ নামের এই রোভারকে আধুনিকায়ন করে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পাঠানো হবে। সেখানে বরফ-পানির সন্ধান, চন্দ্রপৃষ্ঠ ও এর নিচের বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধানসহ ভবিষ্যতে চন্দ্রঘাঁটি স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে।
জুনের শেষভাগে নাসা চাঁদের উদ্দেশ্যে ‘প্রমিস’ পাঠানোর নতুন পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়। রোভারটি মূলত মঙ্গলে ব্যবহৃত ‘কিউরিওসিটি’ ও ‘পার্সিভ্যারেন্স’ রোভারের পরীক্ষামূলক মডেলের প্রযুক্তি সমন্বয়ে তৈরি করা হবে। পার্সিভ্যারেন্স রোভারের প্রকৌশলগত পরীক্ষামূলক মডেলটির আগের নাম ছিল ‘অপটিমিজম’।
মঙ্গলে জটিল অভিযান পরিচালনার আগে প্রযুক্তির সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য পৃথিবীতে কিউরিওসিটি ও পার্সিভ্যারেন্সের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষামূলক মডেল তৈরি করেছিল নাসা। এসব মডেলের মাধ্যমে মঙ্গলপৃষ্ঠে রোভার পরিচালনার নানা পরিস্থিতি পৃথিবীতে অনুকরণ করে পরীক্ষা করা হয়। এবার সেই পরীক্ষিত প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে চাঁদের জন্য নতুন রোভার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি।
নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান বলেন, মঙ্গলে রোভার পরিচালনার কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা এবং সরকারি অর্থায়নে তৈরি মূল্যবান হার্ডওয়্যার তাদের হাতে রয়েছে। এসব প্রযুক্তি সরাসরি চাঁদে ব্যবহার করা গেলে দ্রুত চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে বড় ধরনের অনুসন্ধান সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব হবে।
চাঁদের দক্ষিণ মেরু নাসার ভবিষ্যৎ চন্দ্রঘাঁটি স্থাপনের সম্ভাব্য এলাকা হিসেবে বিবেচিত। কারণ, সেখানকার স্থায়ী বা দীর্ঘ সময় ছায়াবৃত অত্যন্ত শীতল অঞ্চলে বরফ আকারে পানি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যতের মানববাহী চন্দ্রাভিযান ও স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপনের ক্ষেত্রে এই পানি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
‘প্রমিস’কে দক্ষিণ মেরুতে প্রাথমিক অনুসন্ধানের পাশাপাশি চন্দ্রপৃষ্ঠ ও এর নিচের স্তরের বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করার কাজে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম ও দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকা অঞ্চলে রোভারটি কীভাবে কাজ করতে পারে, সেটিও এই অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এ জন্য রোভারটিতে পারমাণবিক শক্তিচালিত তাপবিদ্যুৎ উৎপাদক যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বহু-মিশন তেজস্ক্রিয় সমস্থানিক তাপবিদ্যুৎ উৎপাদক নামের এই ব্যবস্থায় জ্বালানি হিসেবে প্লুটোনিয়াম ব্যবহার করা হবে। প্লুটোনিয়ামের স্বাভাবিক তেজস্ক্রিয় ক্ষয় থেকে উৎপন্ন তাপকে বিদ্যুতে রূপান্তর করে এই ব্যবস্থা রোভারকে শক্তি দেবে।
ফলে রোভারটির কার্যক্রম সূর্যের আলোর ওপর নির্ভরশীল হবে না। চাঁদের দীর্ঘ ও প্রচণ্ড ঠান্ডা রাতের মধ্যেও এটি কাজ চালিয়ে যেতে পারবে। নাসার চন্দ্রঘাঁটি প্রকল্পের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক কার্লোস গার্সিয়া-গালান বলেন, পারমাণবিক শক্তির সুবিধার কারণে আলো কিংবা আলোর অনুপস্থিতি নিয়ে রোভার পরিচালনায় বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকবে না।
তবে ‘প্রমিস’ এখনো চাঁদে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত নয়। পুরো পরিকল্পনাটি বর্তমানে প্রস্তাবনার পর্যায়ে রয়েছে। পৃথিবীতে থাকা পরীক্ষামূলক মডেলটিকে মহাকাশযাত্রার উপযোগী করতে বড় ধরনের কারিগরি পরিবর্তন ও আধুনিকায়ন প্রয়োজন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, রোভারটিতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, মহাকাশ অভিযানের উপযোগী বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, যোগাযোগব্যবস্থা এবং পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থা যুক্ত করতে হবে। চাঁদের তীক্ষ্ণ ও ক্ষয়কারী ধূলিকণার পরিবেশ মোকাবিলার জন্য বর্তমান যন্ত্রাংশেও পরিবর্তন আনতে হবে।
‘প্ল্যানেটারি সোসাইটি’র হিসাবে, ‘প্রমিস’ প্রকল্প বাস্তবায়নে নাসার প্রায় ৭০ থেকে ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় হতে পারে। সব কারিগরি উন্নয়ন সম্পন্ন হলেও ২০৩০ সালের শুরুর আগে রোভারটি চাঁদের উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থাৎ মঙ্গলজয়ের প্রযুক্তি চাঁদের নতুন অভিযানে কাজে লাগানোর এই পরিকল্পনা এখনো সম্ভাবনার পর্যায়ে। তবে বাস্তবায়িত হলে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে বরফ-পানির অনুসন্ধান এবং ভবিষ্যৎ চন্দ্রঘাঁটি স্থাপনের প্রস্তুতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১০/৮/২০২৬