দুবাইয়ে গ্রেফতার সাবেক পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম, খুন ও গণহত্যার অন্তত ১০টি মামলার তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ও ইন্টারপোলের মাধ্যমে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
সোমবার (১৫ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম। এ সময় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম আবদুল কাইয়ুম এবং সাবেক আইজিপি বাহারুল ইসলামও বক্তব্য দেন।
মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে প্রায় ১০টি মামলার তদন্ত চলছে এবং এসব মামলার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে তদন্ত অগ্রসর হয়েছে। তিনি বলেন, র্যাবের মহাপরিচালক থাকাকালে সংঘটিত গুমের কয়েকটি মামলায় বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রধান কৌঁসুলির ভাষ্য অনুযায়ী, শাপলা চত্বরের ঘটনার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং চট্টগ্রামের কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যা মামলাসহ আরও কয়েকটি মামলায় বেনজীর আহমেদের সম্পৃক্ততা নিয়ে তদন্ত চলছে।
তিনি বলেন, র্যাব প্রধান ও পরে পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ট্রাইব্যুনালের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কপি ইতোমধ্যে এনসিবির কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানান প্রধান কৌঁসুলি। তিনি বলেন, তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হবে এবং এনসিবির মাধ্যমে বিষয়টি ইন্টারপোলে প্রেরণ করা হবে।
২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক ছিলেন বেনজীর আহমেদ। এর আগে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি র্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি অবসরে যান। তার বিরুদ্ধে সম্পদ অর্জন ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা থাকলেও ২০২৪ সালের মার্চে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার সম্পদের তথ্য প্রকাশের পর আদালতের নির্দেশে বিষয়টি তদন্ত শুরু হয়। পরবর্তীতে দুর্নীতি দমন কমিশন বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করে।
এ ছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও খুনের অভিযোগ নিয়েও তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বিদেশে অবস্থানরত বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিশ’ জারি করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রোববার জাতীয় সংসদে জানান, ওই রেড নোটিশের ভিত্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে।
মন্ত্রী জানান, দুবাইয়ের এনসিবির সঙ্গে সমন্বয় করে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
সংবাদ সম্মেলনে সাবেক আইজিপি বাহারুল ইসলাম বলেন, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ কার্যকর করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পালন করে। বাংলাদেশের এনসিবি ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে এবং প্রয়োজনীয় আবেদন পাঠায়। তিনি বলেন, আরব আমিরাতের স্থানীয় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে এবং এর আগেও একই ধরনের মামলায় সেখান থেকে আসামি দেশে ফিরিয়ে আনার নজির রয়েছে। বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মত দেন প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট পরোয়ানা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাঠিয়ে প্রত্যর্পণের আবেদন করেছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আরব আমিরাতের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিষয়টি প্রথমে সেখানকার প্রসিকিউটরের কাছে যাবে। পরে আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হবে এবং বিচারাধীন ও তদন্তাধীন মামলাগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী জিজ্ঞাসাবাদ ও পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।
সানা/আপ্র/১৫/৬/২০২৬