প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
অনলাইনে মুঠোফোন বা যেকোনো ডিভাইস খুললেই আজকাল একটি বিষয় প্রায় সবারই নজরে পড়ছে। হঠাৎ করেই এসএমএস, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন ভেসে আসছে। সেগুলো হলো-‘আঁচিল দূর করুন মাত্র তিন দিনে’, ‘অপারেশন ছাড়াই স্থায়ী সমাধান’, ‘১০০% প্রাকৃতিক ওষুধ’, ‘ডাক্তাররা লুকিয়ে রাখছেন এই গোপন চিকিৎসা’, কিংবা ‘আজই অর্ডার করুন, কালই ফলাফল দেখুন’। সাম্প্রতিক সময়ে এসব বার্তার সংখ্যা এত বেড়েছে যে অনেকের মনেই নানা সন্দেহ জাগছে। হঠাৎ আঁচিল নিয়ে এত প্রচারণার কারণ কী? এটি কি সত্যিই জনস্বাস্থ্য সচেতনতা, নাকি এর আড়ালে রয়েছে একটি লাভজনক ব্যবসায়িক ফাঁদ?
বাংলাদেশে অনলাইনে আঁচিল অপসারণের পণ্য বিক্রির বাজার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, একই ধরনের ‘ওয়ার্ট রিমুভার অয়েন্টমেন্ট’, ‘ওয়ার্ট রিমুভার পেন’ এবং ‘স্কিন ট্যাগ রিমুভার’ ইত্যাদি নামে বহু বিক্রেতা পণ্য বাজারজাত করছে। কেউ বলছেন চায়না, কেউ কোরিয়ান, কেউবা দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি—এমন চটকদার বাংলা ও ইংরেজি কথাও বলা হচ্ছে। এক কোম্পানি অন্য কোম্পানির পণ্যকে অকার্যকর ও ভুয়াও বলতে দ্বিধা করছে না। তবে প্রায় সবাই অনলাইনে পণ্যটি কিনতে বলছে। সেখানেই বিভ্রান্তি ও সন্দেহ সৃষ্টি হচ্ছে।
আমরা জানি, আঁচিল বা ওয়ার্ট একটি সাধারণ চর্মরোগ। এটি মূলত মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি)-এর সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে। অধিকাংশ আঁচিল ক্ষতিকর নয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই সময়ের সঙ্গে নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে আঁচিল অপসারণের জন্য ক্রায়োথেরাপি, ইলেকট্রোকটারি, লেজার, স্যালিসাইলিক অ্যাসিডভিত্তিক ওষুধ কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে অন্যান্য পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা মুঠোফোনের এসএমএসে যে অলৌকিক চিকিৎসার প্রচার করা হচ্ছে, তার অধিকাংশেরই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
একটি বিষয় লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এসব বার্তায় সাধারণত মানুষের দুর্বল মানসিকতাকে লক্ষ্য করে ভাষা ব্যবহার করা হয়। যেমন- মুখে আঁচিল থাকলে সৌন্দর্য নষ্ট হয়, বিয়ে ভেঙে যেতে পারে, ক্যানসারে রূপ নিতে পারে, দেরি করলে বিপদ ইত্যাদি। ভয় সৃষ্টি করে মানুষকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করাই যেন এসব বিজ্ঞাপনের মূল কৌশল। অথচ বাস্তবে অধিকাংশ আঁচিল কখনোই ক্যানসারে পরিণত হয় না। আবার সব ধরনের ত্বকের উঁচু অংশ আঁচিলও নয়।
অনেক সময় তিল, স্কিন ট্যাগ বা অন্য কোনো ত্বকের রোগকে আঁচিল ভেবে মানুষ ভুল চিকিৎসা শুরু করে। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, মানুষ চিকিৎসকের পরিবর্তে অজ্ঞাত উৎসের ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অনলাইনে অর্ডার করা বিভিন্ন ক্রিম, তেল, হারবাল দ্রব্য কিংবা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে অনেকেই ত্বকের মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। কোথাও কোথাও দেখা যায়, আঁচিল দূর করতে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থে ত্বক পুড়ে গেছে, সংক্রমণ হয়েছে কিংবা স্থায়ী দাগ তৈরি হয়েছে। অথচ বিজ্ঞাপনে এসব ঝুঁকির কোনো উল্লেখ থাকে না।
আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক প্রতারক প্রতিষ্ঠান চিকিৎসকের ছবি, হাসপাতালের লোগো কিংবা ভুয়া গবেষণার তথ্য ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। ‘বিশ্বখ্যাত গবেষণায় প্রমাণিত’, ‘বিদেশি ডাক্তারদের সুপারিশ’, ‘সরকারি অনুমোদিত’—ইত্যাদি দাবি করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার কোনো প্রমাণ থাকে না। সাধারণ মানুষ বিজ্ঞাপনের চাকচিক্যে আকৃষ্ট হয়ে অর্থ ব্যয় করেন, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল পান না।
ডিজিটাল বিপণনের যুগে ব্যক্তিগত তথ্যও একটি বড় সম্পদ। অনেক সময় বিনামূল্যে পরামর্শের নামে মানুষের নাম, ফোন নম্বর, বয়স, রোগের বিবরণ সংগ্রহ করা হয়। পরে সেই তথ্য ব্যবহার করে বারবার ফোন করা, এসএমএস পাঠানো কিংবা আরও বিভিন্ন পণ্য বিক্রির চেষ্টা করা হয়। অর্থাৎ, একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত তথ্য বাণিজ্যের হাতিয়ারেও পরিণত হচ্ছে।
এখানে ভাবনা জাগতে পারে, হঠাৎ কেন আঁচিল নিয়ে এত প্রচারণা? এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজার বর্তমানে অত্যন্ত লাভজনক। মানুষ নিজের সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হওয়ায় সহজ সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পণ্য বিক্রি করা সহজ হয়ে গেছে। আঁচিল, তিল, ব্রণ, চুল পড়া কিংবা ত্বক ফর্সা করার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আবেগপ্রবণ বাজার তৈরি হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান সেই আবেগকে ব্যবসায়িক সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরে নতুন কোনো গুটি, আঁচিল বা ত্বকের পরিবর্তন দেখা দিলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত একজন নিবন্ধিত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া। কারণ, অনেক সময় যা সাধারণ আঁচিল বলে মনে হয়, সেটি অন্য কোনো ত্বকের রোগ কিংবা বিরল ক্ষেত্রে ত্বকের ক্যানসারের লক্ষণও হতে পারে। আবার বিপরীত ঘটনাও ঘটে। যেমন, সাধারণ আঁচিলকে ক্যানসারের ভয় দেখিয়ে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা বিক্রি করা হয়। তাই সঠিক রোগ নির্ণয় ছাড়া চিকিৎসা শুরু করা বিপজ্জনক।
সরকারি সংস্থা, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ ও টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থারও এ বিষয়ে আরো সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। অনুমোদনহীন ও বিভ্রান্তিকর স্বাস্থ্যবিষয়ক এসএমএস এবং অনলাইন বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান ভুয়া দাবি করে মানুষের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মোবাইল অপারেটর এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ক্ষতিকর বিজ্ঞাপন শনাক্ত ও অপসারণে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা ও ডিজিটাল সাক্ষরতার গুরুত্বও এখানে অপরিসীম। মানুষ যদি বুঝতে শেখে যে প্রতিটি ভাইরাল বার্তা সত্য নয়, প্রতিটি বিজ্ঞাপন বৈজ্ঞানিক নয় এবং প্রতিটি ‘হারবাল’ পণ্য নিরাপদ নয়, তাহলে প্রতারণার সুযোগ অনেক কমে যাবে। বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌথভাবে এ বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
গণমাধ্যমেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। শুধুমাত্র বিজ্ঞাপনের আয় বাড়ানোর জন্য সন্দেহজনক স্বাস্থ্যপণ্যের প্রচারণা চালানো নৈতিকতার পরিপন্থী। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে এসব প্রতারণার নেটওয়ার্ক উন্মোচন করা গেলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদেরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও সক্রিয় হয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক স্বাস্থ্য পরামর্শ প্রচার করা উচিত। এ জন্য ব্যক্তিগত পর্যায়েও কিছু সতর্কতা জরুরি। কোনো এসএমএসে ‘মাত্র একদিনে স্থায়ী সমাধান’, ‘শতভাগ গ্যারান্টি’, ‘আজই অফার শেষ’, ‘ডাক্তারের প্রয়োজন নেই’—এ ধরনের ভাষা দেখলেই সন্দেহ করা উচিত। অজানা ওষুধ ব্যবহার, অগ্রিম অর্থ প্রদান কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার আগে অবশ্যই যাচাই করা প্রয়োজন। চিকিৎসার ক্ষেত্রে শর্টকাটের প্রলোভন অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অনলাইনে আঁচিল দূর করার নামে প্রচারণা চালানো প্ল্যাটফর্ম ও ব্যবসার ধরনগুলোর মধ্যে আরো রয়েছে- ফেসবুক বিজনেস পেজ, ফেসবুক শপ, ইনস্টাগ্রাম স্টোর, টিকটক শপ, ইউটিউব বিজ্ঞাপন, হোয়াটসঅ্যাপ বিজনেস অ্যাকাউন্ট, টেলিগ্রাম সেলস চ্যানেল, ইমো বিজনেস অ্যাকাউন্ট, ব্যক্তিগত ই-কমার্স ওয়েবসাইট, স্বাস্থ্যপণ্য বিক্রির ওয়েবসাইট, হারবাল মেডিসিন শপ, ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক পণ্যের অনলাইন বিক্রেতা, বিউটি ও স্কিন কেয়ার স্টোর, ড্রপশিপিংভিত্তিক অনলাইন দোকান, বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেসের স্বতন্ত্র বিক্রেতা, এসএমএস মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান, ডিজিটাল অ্যাফিলিয়েট মার্কেটার, ইনফ্লুয়েন্সার-নির্ভর বিক্রয় পেজ, লাইভ কমার্স পরিচালনাকারী পেজ এবং কল সেন্টারভিত্তিক স্বাস্থ্যপণ্য বিক্রেতারা।
এসব প্রচারণায় প্রায়ই দাবি করা হয় যে, মাত্র একবার ব্যবহারেই আঁচিল স্থায়ীভাবে দূর হবে, অস্ত্রোপচার লাগবে না, কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই এবং শতভাগ সফলতা নিশ্চিত। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের ছবি, ভুয়া রোগীর অভিজ্ঞতা (টেস্টিমোনিয়াল), আগে-পরের সম্পাদিত ছবি এবং কথিত বিদেশি গবেষণার উদ্ধৃতি ব্যবহার করে ক্রেতাদের প্রভাবিত করা হয়। অথচ এসব দাবির অধিকাংশের পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয় না।
আঁচিল নিয়ে সচেতনতা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সচেতনতার নামে ভয় সৃষ্টি কিংবা প্রতারণা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকার, ব্যবসায়িক প্রতারণার ক্ষেত্র নয়। মানুষের উদ্বেগকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা এই অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আগামী দিনে শুধু আঁচিল নয়, আরও অসংখ্য রোগের নামে একই ধরনের প্রতারণা বাড়তে থাকবে।
আজকাল মুঠোফোনের মেসেজে হঠাৎ আঁচিলের পাঁচালি কোনো কাকতালীয় বিষয় মনে করা উচিত হবে না। এটি একটি বাণিজ্যিক প্রবণতার হঠাৎ সন্দেহজনক বিস্ফোরণ হিসেবে ধরা যায়, যেখানে মানুষের স্বাস্থ্য-উদ্বেগকে পণ্য বিক্রির কৌশলে রূপ দেওয়া হচ্ছে। তাই প্রতিটি বার্তা বিশ্বাস করার আগে যুক্তি, বিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শকে গুরুত্ব দিতে হবে। সচেতন নাগরিক, দায়িত্বশীল রাষ্ট্র, নৈতিক গণমাধ্যম এবং জবাবদিহিমূলক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—এই চারটি স্তম্ভই পারে স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতারণার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। কারণ, একটি বিভ্রান্তিকর এসএমএস কখনো কখনো শুধু অর্থের ক্ষতিই করে না; এটি মানুষের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ওয়েব অনুসন্ধানে বাংলাদেশে আঁচিল অপসারণের পণ্য বিক্রি বা প্রচার করে এমন শতাধিক প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন বিক্রেতা ও স্টোরের নাম পাওয়া গেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এদের কাউকেই আমরা সরাসরি প্রতারক বা সন্দেহজনক বলতে পারছি না, কারণ সে ধরনের কোনো আদালতের রায় বা সরকারি সিদ্ধান্ত আমাদের কাছে নেই। তবে জনস্বার্থে এ বিষয়ে দ্রুত সরকারি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
লেখক: প্রফেসর, সমাজকর্ম বিভাগ ও সাবেক ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/৩১.০৭.২০২৬