সাইফুল ইসলাম
তেলের দাম বাড়লে শুধু তেলের দামই বাড়ে- এমন সরল অর্থনীতি পৃথিবীতে কোথাও নেই। তেল এমন এক পণ্য, যার দাম বাড়লে তার ঢেউ পরিবহন থেকে কৃষি, কৃষি থেকে খাদ্য, খাদ্য থেকে শিল্প, শিল্প থেকে ভোক্তার সংসার- সর্বত্র গিয়ে লাগে। অর্থনীতির ভাষায় জ্বালানি একটি ‘কস্ট পুশ’ বা ব্যয়-চালিত মূল্যস্ফীতির উৎস; সাধারণ মানুষের ভাষায়, বাজারের এক প্রান্তে যে আগুন জ্বলে, তার তাপ অন্য প্রান্তে গিয়ে পৌঁছায়।
বাংলাদেশে সেই আগুনের আঁচ এখন নতুন করে অনুভূত হচ্ছে। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ চার ধরনের প্রধান জ্বালানির দামই এক লাফে ২০ টাকা করে বেড়েছে।
সরকারের সামনে যে সংকটটি রয়েছে, সেটিও অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের বিপুল অংশ আমদানি করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১০.৬৩ বিলিয়ন ডলার—আগের অর্থবছরের ৫.১৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১০৭ শতাংশ বেশি। মোট পণ্য আমদানির ১৪.১৩ শতাংশই গেছে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানিতে। অর্থাৎ জ্বালানি শুধু মূল্যস্ফীতির প্রশ্ন নয়; বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও বড় চাপ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থার আর্থিক চাপ।
সরকারি হিসাবে মার্চ থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শুধু ডিজেলেই প্রতি লিটারে প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছিল এবং দৈনিক লোকসান ছিল প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। নতুন মূল্য সমন্বয়ের ফলে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত লোকসান কমতে পারে বলে সরকার আশা করছে। তাই দাম না বাড়ালেও বিপদ; দাম বাড়ালেও বিপদ। দাম না বাড়ালে রাষ্ট্রকে ভর্তুকি দিতে হয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে এবং সরকারি জ্বালানি সংস্থার লোকসান বাড়ে। আর দাম বাড়ালে সেই ব্যয় সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে জনগণ ও ব্যবসার ওপর চলে আসে। এটিই জ্বালানি অর্থনীতির কঠিন বাস্তবতা।
প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের হিসাবের খাতা আর মানুষের সংসারের খাতার মধ্যে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেওয়া যায় না। রাষ্ট্র যদি অসীম ভর্তুকি দিয়ে তেল সস্তা রাখে, তার অর্থ শেষ পর্যন্ত করদাতা কিংবা অন্য কোনো সরকারি ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। আবার রাষ্ট্র যদি হঠাৎ বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি করে, তার অভিঘাত পড়ে সেই মানুষটির ওপর যার আয় বাড়ে না, কিন্তু বাজারের দাম বাড়ে।
তেলের দাম বৃদ্ধির প্রথম আঘাত পড়বে পরিবহনে। ডিজেলনির্ভর বাস, ট্রাক, নৌযান ও কৃষিযন্ত্রের পরিচালন ব্যয় বাড়বে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পণ্য পাঠানোর খরচ বাড়বে। তারপর সেই বাড়তি খরচ যুক্ত হবে পাইকারি দামে, সেখান থেকে খুচরা দামে। অর্থাৎ একজন নাগরিক নিজের গাড়িতে তেল না কিনলেও তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবেন না।
কৃষিতে এর প্রভাব আরও সরাসরি। সেচ, জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা ও কৃষিপণ্য পরিবহনের নানা পর্যায়ে ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে পারে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কৃষককে হয় কম লাভে বিক্রি করতে হবে, নয়তো বাড়তি খরচ পণ্যের দামে তুলতে হবে। দ্বিতীয়টি হলে খাদ্যবাজারে তার প্রতিফলন ঘটবে। অর্থাৎ তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে চাল, সবজি, মাছ কিংবা অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামের সম্পর্কটি সরাসরি নয়। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট বাস্তব। শিল্প ও ব্যবসার ক্ষেত্রেও একই সূত্র কাজ করে। উৎপাদন, পরিবহন, লজিস্টিকস ও সরবরাহব্যবস্থার খরচ বাড়লে ব্যবসার ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ বাড়ে। বাংলাদেশ-থাই চেম্বারের সভাপতি শামস মাহমুদ বলেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন, লজিস্টিকস, কৃষি, সেবা ও দ্রুত বিক্রয়যোগ্য ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় ব্যয় বাড়াবে এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
এখানে অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি হলো ক্রয়ক্ষমতা। একজন মানুষের আয় যদি একই থাকে অথচ পরিবহন, খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে, তাহলে প্রকৃত অর্থে তার আয় কমে যায়। মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিক এটাই—বেতননামায় টাকার অঙ্কটি অপরিবর্তিত থাকে, কিন্তু সেই টাকায় কেনা যায় কম জিনিস।
বিশ্বের অভিজ্ঞতাও তেলের এ অভিঘাতকে সমর্থন করে। বিশ্বব্যাংকের গত পাঁচ দশকের বৈশ্বিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওঠানামায় তেলের মূল্য-ধাক্কার অবদান ৩৮ শতাংশের বেশি। তাদের মডেল অনুযায়ী তেলের দামে ১০ শতাংশ ইতিবাচক ধাক্কা এলে এক বছরের মধ্যে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি প্রায় ০.৩৫ শতাংশ পয়েন্ট এবং তিন বছরের মধ্যে প্রায় ০.৫৫ শতাংশ পয়েন্ট বাড়তে পারে।
১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট এই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক উদাহরণ। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৯ সালের তেল সংকটকে কেন্দ্র করে ৫৬টি দেশে ১০০টির বেশি মূল্যস্ফীতির অভিঘাত বিশ্লেষণ করে ওগঋ দেখেছে, এর মধ্যে ৬০টির বেশি পর্ব তৎকালীন তেল সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। এসব মূল্যস্ফীতির মাত্র ৬০ শতাংশ পাঁচ বছরের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে ফিরেছিল এবং সফল ক্ষেত্রগুলোতেও মূল্যস্ফীতি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে গড়ে তিন বছরের বেশি সময় লেগেছিল। তবে ১৯৭০-এর দশকের পৃথিবীকে ২০২৬ সালের বাংলাদেশের সঙ্গে হুবহু তুলনা করা ঠিক হবে না।
বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতির তেল-নির্ভরতা তুলনামূলক কমেছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বেড়েছে এবং অনেক দেশের মুদ্রানীতি আগের তুলনায় শক্তিশালী। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতার বিষয়টি এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বছরে যে পরিমাণ পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ব্যবহার করে তার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য-ধাক্কা এখানে দ্রুত বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়, অভ্যন্তরীণ জ্বালানি মূল্য এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার দামের ওপর এসে পড়ে।
এবার প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতিতে সরকারের করণীয় কী? প্রথম কাজ হওয়া উচিত মূল্যবৃদ্ধির দ্বিতীয় দফার অভিঘাত ঠেকানো। তেলের দাম ২০ টাকা বাড়ল বলে কোনো পণ্যের দাম ২০ শতাংশ বাড়ার অর্থনৈতিক যুক্তি নেই। কিন্তু বাজারে এমন অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হলে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত অভিঘাতের চেয়ে বাজার-মনস্তত্ত্বের অভিঘাত বড় হয়ে উঠতে পারে। পরিবহন ভাড়া, কৃষিপণ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে তাই তথ্যভিত্তিক নজরদারি জরুরি। দ্বিতীয় কাজ হলো ভর্তুকির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা। সবাইকে সস্তা জ্বালানি দেওয়ার নীতি অনেক সময় ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে একই সুবিধা দেয়। তার পরিবর্তে কৃষক, গণপরিবহন এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হতে পারে। তৃতীয় কাজ দীর্ঘমেয়াদি। বাংলাদেশকে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎচালিত গণপরিবহন, রেলপথের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে তেলের আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা কমানো সম্ভব। একটি দেশ যত বেশি নিজের শক্তির উৎস বৈচিত্র্যময় করতে পারে, আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের হাতে তার অর্থনীতি তত কম জিম্মি থাকে।
সবচেয়ে বড় কথা, জ্বালানির মূল্যনীতি শুধু অর্থ মন্ত্রণালয় কিংবা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের হিসাবের বিষয় নয়। এটি মানুষের জীবনযাত্রার প্রশ্ন, শিল্পের প্রতিযোগিতার প্রশ্ন, কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের প্রশ্ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রশ্ন- সবকিছুর সম্মিলিত প্রশ্ন।
তেলের দাম বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি আছে। দাম না বাড়ানোর পক্ষেও যুক্তি আছে। কিন্তু কোনো যুক্তিই একা যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে দুটি হিসাব করতে হবে- একদিকে কত টাকা ভর্তুকি দিলে অর্থনীতি টিকবে, অন্যদিকে কত টাকা মূল্যবৃদ্ধি দিলে মানুষের জীবন টিকবে। কারণ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় পরিসংখ্যান কখনো জিডিপি নয়, কখনো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও নয়। শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির সাফল্য মাপা হয় একজন সাধারণ মানুষের জীবনে- মাসের শেষে তার হাতে থাকা টাকায় কতটা খাবার কেনা যায়, সন্তানের স্কুলের বেতন দেওয়া যায় কি না, বাড়ি থেকে কর্মস্থলে যাওয়া যায় কি না। তাই তেলের দাম শুধু তেলের দাম নয়। এটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও নাগরিকের অর্থনীতির মাঝখানে টানটান একটি দড়ি।
দড়ির এক প্রান্তে বৈদেশিক মুদ্রা, ভর্তুকি ও রাষ্ট্রীয় লোকসান। অন্য প্রান্তে সাধারণ মানুষের আয়, বাজারদর ও ক্রয়ক্ষমতা। রাষ্ট্র যদি এক প্রান্তের ভার কমাতে গিয়ে অন্য প্রান্তটি ছিঁড়ে ফেলে, তবে হিসাবের খাতা হয়তো সাময়িকভাবে সুন্দর দেখাবে; কিন্তু অর্থনীতির ঘরে তখন সত্যিই আগুন জ্বলবে। তাই প্রশ্ন তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে কি না- সেটি নয়।
প্রশ্ন হলো, এই বাড়তি দামের আগুন নিয়ন্ত্রণ করার মতো পানি রাষ্ট্রের হাতে আছে কি না।
লেখক : কলামিস্ট
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/১০.০৯.২০২৬