গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

মেনু

মানব পাচার: সভ্যতার অন্ধকার গহ্বর থেকে মুক্তির সংগ্রাম

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:১৫ পিএম, ৩০ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২০:৩৫ এএম ২০২৬
মানব পাচার: সভ্যতার অন্ধকার গহ্বর থেকে মুক্তির সংগ্রাম
ছবি

ছবি সংগৃহীত

ড. হারুন রশীদ    

মানবসভ্যতা যতই উন্নত হোক, কিছু কলঙ্কজনক বাস্তবতা আজও আমাদের বিবেককে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করে। মানব পাচার তেমনই এক নির্মম বাস্তবতা। প্রযুক্তির উৎকর্ষ, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং বৈশ্বিক সংযোগের এই যুগেও পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ আধুনিক দাসত্বের শিকার হচ্ছে। তাদের কেউ বাধ্যতামূলক শ্রমে নিযুক্ত, কেউ যৌন শোষণের শিকার, কেউ প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে নিয়ে গিয়ে অমানবিক পরিস্থিতিতে আটকে রাখা হয়েছে। কেউ আবার পাচারচক্রের হাতে পড়ে নিজের পরিচয়, স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা হারিয়েছে।

প্রতি বছর ৩০ জুলাই পালিত হয় মানব পাচারবিরোধী বিশ্ব দিবস। ২০১৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ দিনটি ঘোষণা করে, যাতে মানব পাচারের ভয়াবহতা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং পাচারের শিকার ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়। কিন্তু দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতা যত বাড়ছে, বাস্তবতার নির্মমতা যেন ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, মানব পাচার এখন বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধগুলোর একটি। মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের পর মানব পাচারকে সবচেয়ে বড় অবৈধ ব্যবসাগুলোর মধ্যে গণ্য করা হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার যৌথ হিসাব অনুযায়ী বিশ্বে প্রায় ৫ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের আধুনিক দাসত্বের শিকার। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নারী ও শিশু।

বাংলাদেশের জন্য মানব পাচার একটি জটিল ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার ঘনত্ব, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রবল আকাক্সক্ষা- সব মিলিয়ে মানব পাচারকারীরা এখানে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনুকূল পরিবেশ খুঁজে পায়। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল, সীমান্তবর্তী জেলা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী পাচারের ঝুঁকিতে বেশি থাকে।

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ বৈধ ও অবৈধ উভয় উপায়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। তাদের অধিকাংশই দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। রেমিট্যান্স আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু ওই স্বপ্নের যাত্রাপথে অনেকেই প্রতারক দালালচক্রের ফাঁদে পড়েন। উন্নত জীবনের আশায় ঘরবাড়ি বিক্রি করে কিংবা ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়া অনেক মানুষ পরে মানবপাচারের শিকার হন। লিবিয়া, ভূমধ্যসাগর, মালয়েশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি অভিবাসীদের দুর্ভোগের অসংখ্য ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

কেউ জিম্মি হয়েছেন, কেউ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কেউ শ্রমদাসে পরিণত হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারগুলো মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হয়েছে। আবার অনেকের মৃত্যু হয়েছে সমুদ্রপথে কিংবা মরুভূমিতে। মানবপাচারের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো নারী ও শিশু পাচার। বাল্যবিয়ে, পারিবারিক সহিংসতা, দারিদ্র্য এবং শিক্ষার অভাব অনেক নারী ও কিশোরীকে ঝুকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দেয়। চাকরি, বিয়ে কিংবা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের পাচার করা হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। অনেক শিশুকে জোর করে শ্রমে নিয়োজিত করা হয় আবার কেউ কেউ ভিক্ষাবৃত্তি, অপরাধচক্র কিংবা যৌন শোষণের শিকার হয়।

ডিজিটাল যুগ মানব পাচারের চরিত্রেও পরিবর্তন এনেছে। আগে যেখানে পাচারকারীরা সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে মানুষকে প্রলুব্ধ করত, এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা নতুন কৌশলে মানুষকে ফাঁদে ফেলছে। ভুয়া নিয়োগপত্র, বিদেশে চাকরির প্রলোভন কিংবা অনলাইন সম্পর্কের মাধ্যমে প্রতারণা ক্রমশ বাড়ছে। ফলে মানব পাচারবিরোধী লড়াইয়ে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ সরকার মানব পাচার প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, জাতীয় কর্মপরিকল্পনা, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এবং সীমান্ত পর্যায়ে নজরদারি বৃদ্ধি- এসব উদ্যোগ ইতিবাচক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বিভিন্ন সময় পাচারচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে। তবু বাস্তবতা হলো, মানব পাচারের নেটওয়ার্ক অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সঙ্গে সংযুক্ত। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে- কেবল আইন প্রয়োগ করে কি মানব পাচার বন্ধ করা সম্ভব? উত্তর হলো, না। কারণ মানব পাচারের মূল শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত।

দারিদ্র্য, বৈষম্য, বেকারত্ব, শিক্ষার অভাব, সামাজিক অনিরাপত্তা এবং নিরাপদ অভিবাসনের সীমিত সুযোগ মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। তাই মানব পাচার প্রতিরোধে প্রয়োজন বহুমাত্রিক ও সমন্বিত উদ্যোগ। এ জন্য প্রথমেই নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বৈধ চ্যানেলকে সহজ, সাশ্রয়ী এবং স্বচ্ছ করতে হবে।

দালালনির্ভর ব্যবস্থা কমিয়ে সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা জরুরি। বিদেশগামী কর্মীদের প্রশিক্ষণ, তথ্যসেবা এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া  স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। ইউনিয়ন, উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে মানব পাচারবিরোধী প্রচারণা জোরদার করা প্রয়োজন। মানুষকে জানতে হবে কীভাবে পাচারকারীরা কাজ করে, কী ধরনের প্রতারণা করে এবং কীভাবে নিরাপদে বিদেশে যাওয়া যায়। সচেতনতা অনেক সময় আইন থেকেও বেশি কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দিতে হবে। দেশের ভেতরে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পেলে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের প্রবণতা কমবে। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পাচারের শিকার ব্যক্তিদের পুনর্বাসন অগ্রাধিকার দিতে হবে। অনেক সময় উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যাত হন বা অর্থনৈতিকভাবে অসহায় হয়ে পড়েন। ফলে তারা আবারও ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। তাঁদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে। মানব পাচার কোনো একক দেশের সমস্যা নয়; একটি আন্তঃসীমান্ত অপরাধ। তাই তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ তদন্ত এবং অপরাধীদের প্রত্যর্পণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।

আমাদের মনে রাখতে হবে মানব পাচার কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার, উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। একজন মানুষ যখন প্রতারণার শিকার হয়ে স্বাধীনতা হারান, তখন শুধু একজন ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রের মানবিক ভিত্তি।

মানব পাচারবিরোধী বিশ্ব দিবস তাই কেবল একটি প্রতীকী দিন নয়। এটি আমাদের সম্মিলিত আত্মসমালোচনার দিন। আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, যেখানে একজন মানুষ বেঁচে থাকার জন্য নিজের জীবনকে পাচারকারীর হাতে তুলে দিতে বাধ্য হবে না? আমরা কি এমন রাষ্ট্র গড়তে পেরেছি, যেখানে নিরাপদ কর্মসংস্থান, মর্যাদাপূর্ণ জীবন এবং মানবিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পাওয়ার মধ্যেই মানব পাচারবিরোধী সংগ্রামের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত। কারণ মানব পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই আসলে মানুষের মর্যাদা রক্ষার লড়াই, স্বাধীনতার লড়াই এবং সভ্যতার আত্মাকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যাওয়ার লড়াই। যতদিন পৃথিবীর কোথাও একজন মানুষও শোষণের শিকার হবে, ততদিন এই সংগ্রাম চলতেই থাকবে। আর সেই সংগ্রামে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও নাগরিক- সবাইকে হতে হবে সমানভাবে সচেতন, সক্রিয় ও দায়বদ্ধ।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/৩০.০৭.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

‘শ্রাবণের মেঘ’ ও নীতিপুলিশি: শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষার দায়
৩০ জুলাই ২০২৬

‘শ্রাবণের মেঘ’ ও নীতিপুলিশি: শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষার দায়

রুদমিলা মাহবুবআজ অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে লিখতে বসেছি এই আবেদনপত্র। জানি না, শিক্ষক হিসেবে আম...

খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি ও করণীয়
৩০ জুলাই ২০২৬

খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি ও করণীয়

মোশতাক আহমেদদেশে প্রায় এক কোটি ৫৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায়...

দেশ বদলাতে চাইলে, শিক্ষকের জীবনমান ও শিক্ষা বদলান
২৯ জুলাই ২০২৬

দেশ বদলাতে চাইলে, শিক্ষকের জীবনমান ও শিক্ষা বদলান

মোঃ সেলিমুজ্জামানএকটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু উঁচু দালান, প্রশস্ত সড়ক, উচ্চতর ডিগ্রি, ভালো ফলাফল কি...

একদিকে ক্ষুধার লড়াই, অন্যদিকে কোটিপতির উত্থান
২৯ জুলাই ২০২৬

একদিকে ক্ষুধার লড়াই, অন্যদিকে কোটিপতির উত্থান

শাহানা হুদা রঞ্জনা    অনেকের মনেই এখন একই প্রশ্ন- একই অঙ্কের বেতন পেয়েও গত কয়েক...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

শিল্পী বললেন ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ এখন প্রতিবাদের ভাষা

‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে গানটি সিলেটের এক শিক্ষিকাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া সমালোচনার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে শিক্ষকদের সংহতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। গানটির গায়ক মেজবাহ রহমান বলেন, “আমাদের এই গানটি যে অন্যায্য সমালোচনার বিরুদ্ধে একটি বড় সামাজিক আন্দোলনের ভাষা হয়ে উঠবে, তা কখনো ভাবিনি। গানটি মূলত প্রকৃতিকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু যেভাবে এটি ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে এখন এটি অনেকের কাছে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।” প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন গানটি সত্যিই প্রতিবাদের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে