বিরোধী সংসদ সদস্যদের আপত্তি ও ছাঁটাই প্রস্তাব নাকচ করে নতুন অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে অর্থ বিভাগের জন্য ২৩ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকার মঞ্জুরি দাবি জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
সোমবার (১৫ জুন) সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থ বিভাগের এই মঞ্জুরি দাবি উত্থাপন করেন। এ সময় বিরোধী সদস্যরা ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের সংকোচন এবং বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে তাদের উত্থাপিত ছাঁটাই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে গেলে মঞ্জুরি দাবিটি গৃহীত হয়।
বিরোধীদের সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচির আওতায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের আসল ও সুদ মওকুফ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিভুক্ত দুটি ও কর্মসূচির বাইরে থাকা চারটি প্রকল্পে অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন হয়েছে।
তিনি বলেন, “অর্থ বিভাগের নিজস্ব ব্যয় মেটানোর জন্য এ অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়নি। বাড়তি বরাদ্দের প্রস্তাবটি যৌক্তিক। এ কারণে ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করা সম্ভব নয়।”
বিরোধী সদস্যদের বক্তব্যে উঠে আসে, একদিকে সরকার ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে, অন্যদিকে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য সহায়তা তহবিল গঠন করছে। এতে আর্থিক খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সম্পূরক বাজেটের নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল অনুযায়ী, অর্থ বিভাগের মোট সম্পূরক বরাদ্দ ২৮ হাজার ৬৫৫ কোটি ৫৪ লাখ ৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত ব্যয় ৫ হাজার কোটি টাকা এবং সংসদে ভোটে গৃহীত মঞ্জুরি ২৩ হাজার ৬৫৫ কোটি ৫৪ লাখ ৫ হাজার টাকা।
চলতি অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে মোট ৫৬ হাজার ১১৭ কোটি ৫৯ লাখ ৪১ হাজার টাকার অতিরিক্ত বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ হাজার ১১১ কোটি ৭৭ লাখ ৫৬ হাজার টাকা দায়যুক্ত ব্যয় এবং ৫০ হাজার ৫ কোটি ৮১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা সংসদে ভোটে গৃহীত মঞ্জুরি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ঢাকা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন বলেন, অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকিং খাতের বর্তমান আমানত ও বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে এ বিপুল অর্থ সংগ্রহ কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “একদিকে সরকার ৪০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা তহবিল গঠনের কথা বলছে, অন্যদিকে একই খাত থেকে বিপুল ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তাহলে বিষয়টি এলোমেলো হয়ে যায়।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, গত দেড় দশকে ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। দৃশ্যমান ব্যবসা না থাকা ব্যক্তিদের ঋণ দেওয়া হয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় সুদের হার ও ডলারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থা এবং বৈদেশিক ঋণনির্ভর অর্থায়নের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
কুষ্টিয়া-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আবদুল গফুর বলেন, নির্ধারিত বরাদ্দের মধ্যে ব্যয় সীমাবদ্ধ রাখতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ ও মিতব্যয়িতার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
তার মতে, অর্থবছরের শুরু থেকেই ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অধিক শৃঙ্খলা থাকলে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব হতো।
আলোচনা শেষে রুমিন ফারহানা, শাহজাহান চৌধুরী ও আবদুল গফুরের উত্থাপিত ছাঁটাই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। পরে অর্থ বিভাগের মঞ্জুরি দাবি সংসদে পাস হয়।
সানা/আপ্র/১৫/৬/২০২৬