সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজেদের ‘সংখ্যালঘু’ না ভেবে সমঅধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে আত্মমর্যাদা নিয়ে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেন, ‘নিজেকে ছোট করবেন না। আপনার অধিকার আপনাকেই নিতে হবে। জোর গলায় বলতে হবে- এটা আমার অধিকার।’
শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাজধানীর কাকরাইলে সম্মিলিত সনাতন পরিষদ আয়োজিত ‘সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধান’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা ও প্রতিনিধি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার একটি বক্তব্য স্মরণ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘তিনি সবসময় বলতেন, আপনাদের আমি কখনো সংখ্যালঘু মনে করি না। আপনারা এ দেশের সন্তান। এ দেশে আমার যে অধিকার, আপনাদেরও সেই একই অধিকার। এই কথাটি মনে রাখতে হবে।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত আবাসভূমি। হাজার বছরের সহাবস্থানের ঐতিহ্যের এই দেশে ধর্মকে কেন্দ্র করে বিভাজনের কোনো স্থান নেই।
সবার অধিকার রক্ষায় সরকারের অবস্থান: সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা ও সম্পদ সুরক্ষায় সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সব ধর্মের মানুষের অধিকার রক্ষায় সচেতনভাবে কাজ করছে।
তিনি উল্লেখ করেন, গত দুর্গাপূজায় বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা পূজামণ্ডপে উপস্থিত থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করেছেন। ইসকনের রথযাত্রাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সরকারের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সমস্যাগুলো দেখভালের জন্য একজন বিশেষ সহকারী নিয়োগ দিয়েছেন। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকার ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করছে।’
তিনি জানান, সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি যাদের মনোনয়ন দিয়েছে, তাদের মধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বী, মতুয়া সম্প্রদায়, সমতলের নৃগোষ্ঠী ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিও রয়েছেন।
‘রেইনবো রাষ্ট্র’ গড়ার কথা: মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা সবাইকে নিয়ে রাজনীতি করতে চাই। আমাদের ৩১ দফায় বাংলাদেশকে একটি রেইনবো রাষ্ট্রে পরিণত করার কথা বলা হয়েছে, যেখানে সব ধর্ম, মত ও সম্প্রদায়ের মানুষ সমান মর্যাদা নিয়ে বসবাস করবে।’
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন দাবি সরকারের নজরে এসেছে জানিয়ে তিনি বলেন, আলোচনা করে সেসব দাবির ইতিবাচক সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
বিভেদের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা: অতীতের তিক্ততা ভুলে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বারবার অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে সামনে এগোনো যায় না। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো বিভেদ সৃষ্টি হবে না।’
একটি মহল ধর্মের নামে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে ধর্মের নামে যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাদের উপেক্ষা করেই সব সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক চেতনাকে আমরা ধরে রাখতে পারিনি। গণতন্ত্র শক্তিশালী হলে মানুষের পারস্পরিক ও ধর্মীয় অধিকার আরো ভালোভাবে সুরক্ষিত হতো।
একাত্তর ও জুলাই- দুটিই গুরুত্বপূর্ণ: মুক্তিযুদ্ধ ও সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমাদের সংস্কৃতি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাইয়ের গণআন্দোলন- সবকিছুকে নিয়েই আমরা এগিয়ে যেতে চাই। যারা একাত্তরকে অস্বীকার করে, তারা বাংলাদেশকেই অস্বীকার করে। একইভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা জীবন দিয়েছে, তাদের আত্মত্যাগও অস্বীকার করা যায় না।’
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘আমরা একই মায়ের সন্তান, বাংলাদেশের সন্তান। আমাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।’
বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ধর্মের ভিত্তিতে যারা দেশকে বিভাজন করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আমরা উগ্রবাদ বা মৌলবাদকে প্রশ্রয় দিতে পারি না। আমরা একটি উদার, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।’
সম্মেলনের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, ময়মনসিংহ-৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সানা/আপ্র/৩১/৭/২০২৬