মোশতাক আহমেদ
দেশে প্রায় এক কোটি ৫৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় চার লাখ ৮৩ হাজার মানুষ অতি সংকটজনক বা জরুরি অবস্থার মধ্যে জীবন যাপন করছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এ সংখ্যা বেড়ে এক কোটি ৮১ লাখে পৌঁছাতে পারে, যার মধ্যে সাত লাখ ৮৭ হাজার মানুষ চরম জরুরি অবস্থায় পড়বে। সম্প্রতি প্রকাশিত ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)-এর খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বিষয়ক সর্বশেষ বিশ্লেষণে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত সৃষ্টি হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্য কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের সরবরাহ ও মূল্য নিয়েও তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব অনিশ্চয়তা। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করে দিয়েছে, এই বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে এবং খাদ্য নিরাপত্তা সংকট আরো বাড়তে পারে। যেহেতু বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থা অনেকাংশেই আমদানিকৃত রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীল, তাই সারের দাম বাড়লে ধান ও অন্যান্য প্রধান ফসলের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে- যা শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের বাজারমূল্যেও প্রভাব ফেলবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ তার ইউরিয়া সারের প্রায় ৮০ শতাংশ সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে আমদানি করে। বর্তমানে দেশটিতে অক্টোবর পর্যন্ত চাহিদা পূরণ করার মতো ইউরিয়া মজুত রয়েছে। এর পরই সংকট দেখা দিতে পারে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ইউরিয়ার দাম বর্তমানে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে গ্যাস সংকটের কারণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে তিনটি উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এই অবস্থা চলমান থাকলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হতে পারেন বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
উদ্বেগজনক তথ্য হলো- দেশের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় দুজন তথা ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় সাত কোটি মানুষ স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাদ্যতালিকা কেনার সামর্থ্য রাখে না। দক্ষিণ এশিয়ায় এ হার পাকিস্তানের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার যৌথভাবে প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে যেখানে একজন মানুষের দৈনিক স্বাস্থ্যকর খাবারের খরচ ছিল ৩.০৯ ডলার (ক্রয়ক্ষমতা সমতার হিসাবে); ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.৫৯ ডলারে। এই ব্যয়বৃদ্ধি নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করাকে ক্রমশ কঠিন করে তুলছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চপর্যায়ে রয়ে গেছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, ডিম, মাছ ও সবজির ক্রমবর্ধমান দাম নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে প্রোটিন জাতীয় খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে। ঋণ নিচ্ছে অথবা উৎপাদনশীল সম্পদ বিক্রি করে দিচ্ছে খাদ্য কেনার জন্য। খাদ্য নিরাপত্তাজনিত এ বাস্তবতার মধ্যেই সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে খাদ্যে ভর্তুকি বা বরাদ্দ ৬১৪ কোটি টাকা কমিয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশের কৃষি খাতে ভর্তুকি ও বাজেট বরাদ্দ কমতে থাকায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কৃষকদের সহায়তা না বাড়ালে খাদ্য উৎপাদন কাক্সিক্ষত হারে বাড়বে না। যার প্রভাব পড়তে পারে বাজারদরে। বর্তমান পরিস্থিতি- উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট, আগাম বন্যা ও কমে যাওয়া ভর্তুকি অব্যাহত থাকলে নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা সংকট আরো তীব্রতর হবে। যার অনিবার্য ফল হবে উচ্চতর খাদ্যমূল্য। এমনটিই আশঙ্কা করা হয়েছে গত ৪ জুলাই বাংলাদেশ ফুড সিকিউরিটি নেটওয়ার্ক প্রকাশিত ‘এগ্রিকালচারাল বাজেটিং ইন বাংলাদেশ: ট্রেন্ডস, প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক আউটলুক’ শীর্ষক এক গবেষণায়। এতে বলা হয়েছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ভোগান্তি বাড়িয়ে চলেছে, যার অভিঘাতে বাংলাদেশে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, খোলাবাজারে বিক্র (ওএমএস) ও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে বরাদ্দ কমানো হলে খাদ্য মূল্যস্ফীতির এই সময়ে তা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হবে এবং দারিদ্র্যের হার আরো বাড়বে।
চলমান বাস্তবতায় সরকার যদি এখনই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তাহলে সংকট যে আরো তীব্রতর হবে, তা বলাই বাহুল্য। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ওএমএস ও টিসিবির কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং প্রয়োজনে সম্প্রসারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে, বিশেষত মূল্যস্ফীতির এই সময়ে। এ ছাড়া স্থানীয় সার উৎপাদন ও বিকল্প উৎস হিসেবে আমদানি-নির্ভরতা কমাতে দেশীয় সার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিকল্প সরবরাহ উৎস খুঁজে বের করা দরকার, যাতে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটলেও কৃষি উৎপাদন ব্যাহত না হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, অনাগত সংকট বিবেচনায় রেখে যত দ্রুত সম্ভব একটা ‘হলিস্টিক’ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে সামনে এগোতে হবে।
এ কথা সত্য, দেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। কিন্তু ক্রয়ক্ষমতার ঘাটতি, উচ্চ খাদ্যমূল্য এবং নতুন করে বৈশ্বিক সার সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি; সবকিছু মিলিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগ অমূলক নয়। আগামী দিনগুলোতে সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া এই ঝুঁকি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল উৎপাদনের বিষয় নয়। এটি একই সঙ্গে ন্যায্যতা, সহনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়ও বটে।
লেখক: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলামিস্ট
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/৩০.০৭.২০২৬