বিদ্যুৎ উৎপাদন ও যানবাহনে ব্যবহৃত সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাসের (সিএনজি) দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠিয়েছে পেট্রোবাংলা। প্রস্তাব অনুযায়ী বিদ্যুৎ খাতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১৫ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা এবং যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজির পাম্পমূল্য ৪৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৬৫ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
তবে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান দাবি করেছেন, মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রস্তাবটি মূলত সিএনজি স্টেশন মালিকদের মার্জিন বৃদ্ধির দাবির সঙ্গে সম্পর্কিত।
পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সিএনজি খাতে নতুন গ্যাসমূল্যের প্রস্তাব জ্বালানি বিভাগে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাব কার্যকর হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটারে ৯ টাকা ৫০ পয়সা বা প্রায় ৬১ শতাংশ বাড়বে। একইভাবে যানবাহনের সিএনজির দাম ২২ টাকা বা প্রায় ৫১ শতাংশ বাড়বে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ২ জুলাইয়ের আদেশ অনুযায়ী বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১৫ টাকা ৫০ পয়সা। সিএনজি গ্রাহকশ্রেণিতে গ্যাসের দাম ৩৮ টাকা এবং স্টেশন মালিকদের মার্জিনসহ যানবাহনের জন্য পাম্পমূল্য ৪৩ টাকা।
গ্যাস সংকটের মধ্যেই নতুন প্রস্তাব: মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন ও কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাব সামনে এসেছে। এর ফলে বাসাবাড়িতে রান্না ব্যাহত হচ্ছে, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমেছে এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে।
চেয়ারম্যানের ব্যাখ্যা: গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব সম্পর্কে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, বিষয়টি সাধারণভাবে গ্যাসের দাম বাড়ানো নয়। দীর্ঘদিন ধরে মার্জিন না বাড়ায় লাভ কমে যাওয়ার কথা জানিয়ে সিএনজি স্টেশন মালিকরা পেট্রোবাংলার কাছে দাবি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘তাদের প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ সিএনজির পাশাপাশি বিদ্যুৎ বা আবাসিক খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সিএনজিরই বাড়বে, এটাও আমি বলছি না।’
চেয়ারম্যান আরো বলেন, স্টেশন মালিকদের দাবি বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়েছে। পরে প্রয়োজন হলে লিখিতভাবে জানানো হবে যে সিএনজির দাম বাড়ানো হচ্ছে না।
বর্তমানে কোন খাতে কত দাম: বিইআরসির বর্তমান আদেশ অনুযায়ী-
* বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার ১৫ টাকা ৫০ পয়সা
* ক্যাপটিভ বিদ্যুতের পুরোনো গ্রাহকদের জন্য ৩১ টাকা ৫০ পয়সা
* নতুন ও অতিরিক্ত ব্যবহারকারীদের জন্য ৪২ টাকা
* সার উৎপাদনে ২৯ টাকা ২৫ পয়সা
* পুরোনো শিল্প গ্রাহকদের জন্য ৩০ টাকা
* নতুন শিল্প গ্রাহকদের জন্য ৪০ টাকা
* চা শিল্পে ১১ টাকা ৯৩ পয়সা
* বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৩০ টাকা ৫০ পয়সা
* মিটারযুক্ত আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ১৮ টাকা
* সিএনজি খাতে ৩৮ টাকা; পাম্পমূল্য ৪৩ টাকা
বিতরণ মাশুল বাড়ানোর আবেদন: তিতাস, বাখরাবাদ, কর্ণফুলী, জালালাবাদ, পশ্চিমাঞ্চল ও সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানিও বিতরণ মাশুল বাড়ানোর আবেদন করেছে। কর্ণফুলী গ্যাস ৩৭ পয়সা থেকে ১ টাকা ২১ পয়সা, বাখরাবাদ ৩০ পয়সা থেকে ৯০ পয়সা, জালালাবাদ ১৮ পয়সা থেকে ৬৩ পয়সা এবং সুন্দরবন ২৪ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
তিতাস গ্যাস দুটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে-সিস্টেম লস ৫ শতাংশ ধরে প্রতি ঘনমিটারে ৩৫ পয়সা এবং সিস্টেম লস ২ শতাংশ হলে ১ টাকা ৪ পয়সা বিতরণ মাশুল।
ঘাটতির হিসাব: পেট্রোবাংলার হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশীয় ও আমদানি করা গ্যাস মিলিয়ে প্রতি ঘনমিটারের গড় ক্রয়মূল্য ছিল ৩১ টাকা ৬৫ পয়সা, কিন্তু গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ২৩ টাকা ৬৩ পয়সা। এতে প্রতি ঘনমিটারে ৮ টাকা ২ পয়সা ঘাটতি হয়েছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এলএনজির আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এপ্রিল থেকে জুন সময়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য ৪৫ টাকা ৭৯ পয়সায় পৌঁছায়, ফলে ওই সময়ে প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ২১ টাকা ৮২ পয়সা লোকসান হয়েছে।
পেট্রোবাংলার হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট আর্থিক ঘাটতি প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে সরকার প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।
আমদানিনির্ভরতা বাড়ার শঙ্কা: পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, একসময় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ২৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে। গত অর্থবছরে মোট গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশ এসেছে আমদানি করা এলএনজি থেকে।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশীয় উৎপাদনের অংশ কমে ৩০ শতাংশে নেমে আসতে পারে এবং মোট সরবরাহের প্রায় ৭০ শতাংশই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়তে পারে।
তবে জ্বালানি বিভাগের নীতিগত সম্মতি পেলেও পেট্রোবাংলার এই প্রস্তাব সরাসরি কার্যকর হবে না। গ্যাসের দাম পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হবে। কমিশন আবেদন যাচাই, আর্থিক বিশ্লেষণ ও গণশুনানি শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
সানা/আপ্র/৩১/৭/২০২৬