গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ: ইতিহাস মুছে নতুন ইতিহাস লেখার চেষ্টা কেন

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ০১:৩৮ পিএম, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ০২:৩১ এএম ২০২৬
ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ: ইতিহাস মুছে নতুন ইতিহাস লেখার চেষ্টা কেন
ছবি

গত সোমবার দুপুরে ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার -ফাইল ছবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি প্রদর্শনের ঘটনা নিছক একটি ছবি রাখা বা সরিয়ে ফেলার বিতর্ক নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রসত্তা, ভাষা, স্বাধিকার, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালির আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ফলে বিষয়টি নিয়ে যে প্রশ্ন ও প্রতিবাদ উঠেছে, তাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।

ইতিহাসের কোনো চরিত্রকে সংগ্রহশালায় রাখা যাবে না-এমন কথা গণতান্ত্রিক সমাজে বলা যায় না। জিন্নাহও উপমহাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোন প্রেক্ষাপটে তাঁকে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং একই ইতিহাসের কোন অধ্যায়কে আড়াল করা হচ্ছে। ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর তিনটি ছবি স্থান পেলেও ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও সাতই মার্চের মতো ঐতিহাসিক অধ্যায়ের কোনো গৌরবোজ্জ্বল ছবি না থাকা নিঃসন্দেহে প্রশ্ন তৈরি করে।

কারণ ইতিহাসের প্রকৃত সত্য হলো, বাঙালির ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের শুরুতেই পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের মার্চে জিন্নাহ ঢাকায় এসে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়েও তিনি বাংলার ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্নে সক্রিয় ছিলেন।

এরপরের ইতিহাস আরো স্পষ্ট। ছয় দফা ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধিকারের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি। সেই কর্মসূচির বিরুদ্ধে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়ন, আগরতলা মামলা এবং পরবর্তী গণঅভ্যুত্থান বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরো শক্তিশালী করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ও ছিল সেই স্বাধিকারের পক্ষে জনগণের সুস্পষ্ট রাজনৈতিক রায়। শেষ পর্যন্ত সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, অসহযোগ আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

এই ইতিহাসের আলোকে জিন্নাহ কেন বাংলাদেশে নিন্দিত, তার উত্তরও পরিষ্কার। তিনি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারেন, কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো বাঙালির ভাষার অধিকারের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান। সেই কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ডাকসু সংগ্রহশালায় তাঁর ছবি থাকলে তার পাশে অবশ্যই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্পষ্ট থাকতে হবে।

আরো বড় প্রশ্ন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কি কেউ মনে করছেন বাংলাদেশ নতুন করে স্বাধীন হয়েছে? যদি তা-ই হয়ে থাকে, তবে সেই ধারণার রাজনৈতিক তাৎপর্য কী? স্বাধীনতার ভিত্তি কি ১৯৭১ নয়, নতুন কোনো রাজনৈতিক পালাবদল? ডাকসু সংগ্রহশালার সাম্প্রতিক বিন্যাস, বঙ্গবন্ধুর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অনুপস্থিতি এবং জিন্নাহর একাধিক ছবি সংযোজন- সবকিছু মিলিয়ে এমন প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। তবে ইতিহাসের জায়গায় রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বসিয়ে ১৯৭১-এর অর্জনকে খাটো করার কোনো সুযোগ নেই।

আরো উদ্বেগের বিষয়, এমন কর্মকাণ্ড যদি বিচ্ছিন্ন ঘটনা না হয়ে পাকিস্তানি রাষ্ট্রচিন্তা বা পরাজিত রাজনৈতিক মতাদর্শকে নতুন করে বৈধতা দেওয়ার প্রবণতার অংশ হয়, তবে তা স্বাধীন বাংলাদেশে অত্যন্ত গুরুতর সংকেত। প্রশ্ন উঠবেই-যে দেশের জন্ম পাকিস্তানি শাসন, বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, সেই দেশে আবার পাকিস্তানি রাষ্ট্রচিন্তার প্রতীককে কী বার্তা দিয়ে সামনে আনা হচ্ছে?

ছাত্রদলসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রতিবাদ তাই কেবল দলীয় প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠতা রক্ষার প্রশ্নও বটে। তবে প্রতিবাদের ভাষা ও পদ্ধতিও হতে হবে গণতান্ত্রিক। ছবি ছিঁড়ে ফেলা যেমন সমাধান নয়, তেমনি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়াও সমাধান নয়।

ডাকসু সংগ্রহশালার জন্য প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, লিখিত ও ইতিহাসবিদদের সমন্বয়ে গঠিত প্রদর্শনী নীতিমালা। সেখানে বঙ্গবন্ধু, ভাসানী, তর্কবাগীশ, ভাষাশহীদ, ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার, শহীদ বুদ্ধিজীবী এবং স্বাধীনতার সংগ্রামের সব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যথাযথ প্রেক্ষাপটে স্থান পাবে। জিন্নাহ থাকলে তিনিও থাকবেন ইতিহাসের সত্য ও বিতর্কসহ; কিন্তু বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাসকে আড়াল করে নয়।

কারণ ইতিহাস বদলে দিলে রাষ্ট্রের জন্ম বদলে যায় না। ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিকল্প নয়। বাংলাদেশ ১৯৭১-এর রক্ত, ভাষা ও স্বাধিকারের দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল। সেই ইতিহাসকে বিকৃত করে, বাদ দিয়ে বা নতুন রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় প্রতিস্থাপন করার যেকোনো প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত জাতির আত্মপরিচয়ের ওপরই আঘাত। তাই এখনই প্রয়োজন ইতিহাস নিয়ে আবেগ নয়, সত্যনিষ্ঠতা; প্রতিহিংসা নয়, প্রামাণ্যতা; এবং সর্বোপরি-স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতি অবিচল দায়বদ্ধতা। 
সানা/আপ্র/১৬/৯/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

বেসরকারি চাকরিজীবীদের অধিকার নিয়ে আর কালক্ষেপণ নয়
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বেসরকারি চাকরিজীবীদের অধিকার নিয়ে আর কালক্ষেপণ নয়

দেশের শ্রমবাজারের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ বেসরকারি খাতের সঙ্গে যুক্ত, অথচ তাঁদের বড় একটি অংশ এখনো...

যাত্রীবেশে গাড়িতে অপরাধীচক্র, রুখবে কে?
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যাত্রীবেশে গাড়িতে অপরাধীচক্র, রুখবে কে?

মানুষ কি এখন পথে বের হওয়ার আগে শুধু নিজের ভাগ্যকেই দায়ী করবে? দিনে-রাতে গণপরিবহনে উঠবে, মহাসড়কে চলবে...

শুধু হুঁশিয়ারি নয়, হাসপাতালে অনিয়ম বন্ধে চাই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শুধু হুঁশিয়ারি নয়, হাসপাতালে অনিয়ম বন্ধে চাই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা

সরকারি হাসপাতাল মানুষের শেষ ভরসা। বিশেষ করে ডেঙ্গুর মতো রোগের প্রাদুর্ভাবের সময়ে অসুস্থ মানুষ যখন সর...

৯/১১-এর ২৫ বছরে যুদ্ধ বেড়েছে, সন্ত্রাসের শিকড় কি কেটেছে?
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৯/১১-এর ২৫ বছরে যুদ্ধ বেড়েছে, সন্ত্রাসের শিকড় কি কেটেছে?

২৫ বছর আগে ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে নয়, বদলে দিয়েছিল গোটা বিশ্বের ন...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই