গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

বেসরকারি চাকরিজীবীদের অধিকার নিয়ে আর কালক্ষেপণ নয়

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৫:৪৮ পিএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৬:৫৪ এএম ২০২৬
বেসরকারি চাকরিজীবীদের অধিকার নিয়ে আর কালক্ষেপণ নয়
ছবি

প্রতিনিধিত্বকারী ছবি

দেশের শ্রমবাজারের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ বেসরকারি খাতের সঙ্গে যুক্ত, অথচ তাঁদের বড় একটি অংশ এখনো চাকরির নিরাপত্তা, ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি, কর্মঘণ্টা, ছুটি, পদোন্নতি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এই বৈপরীত্য শুধু দুঃখজনক নয়, একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের জন্য বিব্রতকরও। ফলে বেসরকারি চাকরিজীবীদের সুরক্ষায় নতুন সার্ভিস রুলস প্রণয়নের সরকারি উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই; কিন্তু উদ্যোগটি যদি সভা-কমিটি-খসড়ার চক্রেই আটকে থাকে, তবে তা হবে প্রত্যাশার সঙ্গে নির্মম পরিহাস।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ৬ কোটি ৯০ লাখ ৯০ হাজার। এর মধ্যে বেসরকারি, যৌথ উদ্যোগ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত আরো ১৮ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ মোট কর্মীর ৬৬ দশমিক ৪ শতাংশই বেসরকারি খাতে কর্মরত। অর্থনীতির এত বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মজীবন যদি অনিশ্চয়তা, বৈষম্য ও অন্যায্য ব্যবস্থার মধ্যে থাকে, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল নিয়ে বড় বড় পরিসংখ্যান প্রকাশের নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

প্রস্তাবিত সার্ভিস রুলসে ন্যূনতম বেতন, নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি, ভাতা, কর্মঘণ্টা, ছুটি, পদোন্নতি, আচরণবিধি, দুর্নীতির তদন্ত, শৃঙ্খলা, আইনি সুরক্ষা ও বিরোধ নিষ্পত্তির পাশাপাশি শিশুশ্রম প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান, চাকরি স্থায়ীকরণ, ক্ষতিপূরণ, মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং চাকরি থেকে অপসারণের বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এসব অধিকারের অনেকগুলো যখন বিদ্যমান শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালাতেও রয়েছে, তখন বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন? নতুন বিধান তৈরির আগে এই ব্যর্থতার জবাব রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।

গত ১০ মে মতবিনিময়সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, চেম্বার ও বেসরকারি খাতের সংগঠনগুলোর মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এরপর আর দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। খসড়া প্রণয়নের নামে অনির্দিষ্টকাল ধরে সভা ও পর্যালোচনা চলতে পারে না।

আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, নতুন সার্ভিস রুলস মালিকপক্ষের সুবিধা রক্ষার আরেকটি প্রশাসনিক দলিল হলে চলবে না। এতে নিয়োগ থেকে অবসান পর্যন্ত চাকরিজীবীর অধিকার সুস্পষ্ট করতে হবে। অন্যায্য বরখাস্ত, বেতন আটকে রাখা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, বৈষম্য ও কর্মক্ষেত্রে হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার থাকতে হবে। অভিযোগ নিষ্পত্তিতে সময়সীমা নির্ধারণ, স্বাধীন তদারকি এবং আইন লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে সরকারকে বুঝতে হবে, অধিকার রক্ষার আইন যত কঠোরই হোক, প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান দুর্বল থাকলে তার মূল্য শূন্য। তাই শ্রম পরিদর্শন ও তদারকি জোরদার, অভিযোগ নিষ্পত্তির সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নজরদারি অপরিহার্য।

বেসরকারি চাকরিজীবীদের শ্রমে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, অথচ তাঁদের অধিকার লঙ্ঘিত হলে রাষ্ট্র নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকতে পারে না। এটি কোনো দয়া, অনুকম্পা কিংবা মালিকের সদিচ্ছার বিষয় নয়; এটি ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। অতএব নতুন সার্ভিস রুলস প্রণয়নের নামে আর কোনো কালক্ষেপণ নয় - সরকারকে নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করে খসড়া চূড়ান্ত, অংশীজনের মতামত গ্রহণ এবং দ্রুত কার্যকর করার বাধ্যতামূলক রূপরেখা দিতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান শ্রম আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মীর ন্যায্য পাওনা, নিরাপত্তা কিংবা মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার লাইসেন্স পেতে পারে না। রাষ্ট্র যদি ৬৬ দশমিক ৪ শতাংশ কর্মীর অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির সব অর্জনই সামাজিক ন্যায়ের পরীক্ষায় অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এখন সময় প্রতিশ্রুতির নয় - রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে, শ্রমের মর্যাদা রক্ষায় তার অবস্থান সত্যিই আপসহীন।
সানা/আপ্র/১৫/৯/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

যাত্রীবেশে গাড়িতে অপরাধীচক্র, রুখবে কে?
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যাত্রীবেশে গাড়িতে অপরাধীচক্র, রুখবে কে?

মানুষ কি এখন পথে বের হওয়ার আগে শুধু নিজের ভাগ্যকেই দায়ী করবে? দিনে-রাতে গণপরিবহনে উঠবে, মহাসড়কে চলবে...

শুধু হুঁশিয়ারি নয়, হাসপাতালে অনিয়ম বন্ধে চাই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শুধু হুঁশিয়ারি নয়, হাসপাতালে অনিয়ম বন্ধে চাই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা

সরকারি হাসপাতাল মানুষের শেষ ভরসা। বিশেষ করে ডেঙ্গুর মতো রোগের প্রাদুর্ভাবের সময়ে অসুস্থ মানুষ যখন সর...

৯/১১-এর ২৫ বছরে যুদ্ধ বেড়েছে, সন্ত্রাসের শিকড় কি কেটেছে?
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৯/১১-এর ২৫ বছরে যুদ্ধ বেড়েছে, সন্ত্রাসের শিকড় কি কেটেছে?

২৫ বছর আগে ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে নয়, বদলে দিয়েছিল গোটা বিশ্বের ন...

আত্মহত্যা প্রতিরোধে সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আত্মহত্যা প্রতিরোধে সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার

প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর পালিত হয় ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’। বর্তমান সময়ে আত্মহত্যার মতো একটি স...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই