মানুষ কি এখন পথে বের হওয়ার আগে শুধু নিজের ভাগ্যকেই দায়ী করবে? দিনে-রাতে গণপরিবহনে উঠবে, মহাসড়কে চলবে, কর্মস্থল থেকে ঘরে ফিরবে-আর প্রতিটি মুহূর্তে ভাববে, পাশের আসনে বসা মানুষটি সহযাত্রী, নাকি ছদ্মবেশী অপরাধী? ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে নারায়ণগঞ্জ ফেরার পথে জাহাঙ্গীর আলমকে চলন্ত বাসে জিম্মি করে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি এবং এক লাখ ৩০ হাজার টাকা আদায়ের পরও তাঁকে আটকে রাখার ঘটনা এই নির্মম প্রশ্নই সামনে এনেছে। সাধারণ যাত্রীদের টাকা ও মুঠোফোন লুটে নামিয়ে দিয়ে একজনকে জিম্মি করে বাস ঘুরিয়ে আবার ময়মনসিংহের দিকে নিয়ে যাওয়া নিছক ডাকাতি নয়; এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।
সৌভাগ্য, ভুক্তভোগীর ভাইয়ের সন্দেহ এবং দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর ফলে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় বাসটির অবস্থান শনাক্ত হয়। র্যাব অভিযান চালিয়ে জাহাঙ্গীরকে উদ্ধার এবং কথিত মূল হোতা জাবেদ ইকবালকে আটক করেছে। তার বিরুদ্ধে ১০টির বেশি ডাকাতির মামলা থাকার তথ্যও এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন একজন কথিত দুর্ধর্ষ অপরাধী একাধিক মামলার পরও কীভাবে আবার একই অপরাধচক্র পরিচালনার সুযোগ পেলেন?
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে চলন্ত বাসে ডাকাতি, যাত্রী জিম্মি, অস্ত্রের মুখে লুট, এমনকি নারী যাত্রীদের নিপীড়নের ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কক্সবাজার, হবিগঞ্জ, টাঙ্গাইল, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধ ডাকাতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। কোথাও সড়কে পেরেকযুক্ত কাঠ ও গাছের গুঁড়ি ফেলে গাড়ি থামানো হয়েছে, কোথাও পুলিশি পোশাকের ছদ্মবেশে পরিবারকে জিম্মি করা হয়েছে। এর আগে সাভারে চলন্ত বাসে যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডাকাতি ও ছুরিকাঘাতের ঘটনাও ঘটেছে।
তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়? নাগরিককে কি বলা হবে, ‘সতর্ক থাকুন, রাতে বের হবেন না, অপরিচিতের পাশে বসবেন না’? মানুষ কি প্রত্যেকে গোয়েন্দা হয়ে চলবে? অপরাধী শনাক্ত করা, গণপরিবহন নিরাপদ রাখা, মহাসড়কে নজরদারি করা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন করা রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব। নাগরিক সচেতনতা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু রাষ্ট্রের ব্যর্থতার দায় জনগণের সতর্কতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
তাই এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, সাঁড়াশি অভিযান। রাজধানী, শহরতলি, বাস টার্মিনাল, ঝুঁকিপূর্ণ মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়ককে অপরাধপ্রবণতা অনুযায়ী চিহ্নিত করে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। পরিবহনশ্রমিকদের পরিচয় ও নিয়োগ যাচাই, অপরাধের পূর্বতথ্য পর্যালোচনা, সন্দেহজনক চক্রের আর্থিক লেনদেন অনুসরণ এবং বাসে জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থাকা পুরোনো মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচার দ্রুত শেষ করতে হবে।
অপরাধী গ্রেফতার হবে, কয়েক দিন পর জামিনে বেরিয়ে আবার একই অপরাধ করবে-এই চক্র চলতে দেওয়া যায় না। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র যদি নাগরিককে নিরাপদে চলাচলের নিশ্চয়তা দিতে না পারে, তবে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাই বা থাকবে কোথায়? মানুষকে ভয় নিয়ে নয়, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে পথে চলার অধিকার দিতে হবে। গণপরিবহন অপরাধীর অভয়ারণ্য হতে পারে না; রাষ্ট্রকে এখনই তা প্রমাণ করতে হবে।
সানা/আপ্র/১৪/৯/২০২৬