জাহিদ রহমান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঝটপট কিছু করার চেয়ে যে কোনো কিছু সঠিক পরিকল্পনায় করতে বেশি উৎসাহবোধ করেন। এ বিষয়টি তিনি সর্বত্র বলেন এবং বাস্তবে করেও দেখাচ্ছেন। একই সঙ্গে জীবনাচারের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি অপচয় রোধেও অঙ্গীকারবদ্ধ। সর্বত্র তাই বার্তা দিচ্ছেন কোনোভাবেই রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় যেমন করা যাবে না, তেমনি অপ্রয়োজনীয় খরচও করা যাবে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই উপলব্ধি ও সুবার্তা রাষ্ট্রের একশ্রেণির কর্মকর্তার হৃদয়কে সেভাবে স্পর্শ করছে বলে প্রতীয়মান নয়। ফলে কোনো না কোনোভাবে অপ্রয়োজনীয় খরচ ও অপচয়ের নানান টালবাহানার খবর চাপা থাকছে না।
প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও জাপানে অনুষ্ঠিতব্য সমাগত ২০তম এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ অনেক বড় এক বহর নিয়ে যাচ্ছে। এত বড় বহর নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে শুধু পদক নয়, বড় আসরে অংশগ্রহণ, অভিজ্ঞতা অর্জন এবং ভবিষ্যতের জন্য ক্রীড়াবিদ তৈরি করাও এবারের অন্যতম লক্ষ্য। তবে ‘পদক পাওয়ার চেয়ে অংশগ্রহণই বড় কথা’ সেই পুরনো তত্ত্বই এবারও পরিস্ফুটিত হয়েছে। বিওএ জাপানের আইচি নাগোয়াকে টার্গেট করে কন্টিনজেন্ট সাজিয়েছে। সে মতে ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবরের এই আয়োজনে এবার ২২টি ডিসিপ্লিনে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে ২৬০ সদস্যের এক বিশাল দল। এর মধ্যে পুরুষ অ্যাথলেট রয়েছে ৯০ জন, নারী অ্যাথলেট ৯৭ জন। আর সঙ্গে থাকছেন ৬১ জন পুরুষ ও ১২ জন নারী কর্মকর্তা। এখানেই শেষ নয়। আরও অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা বা সংগঠক বিভিন্ন পরিচয়ে যাবেন। জাপান বলে কথা! যদিও উল্লিখিত সদস্যরা নিজ খরচে যাবেন বলে বলা হচ্ছে।
৭ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্যই গণমাধ্যমকে জানান বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) সহসভাপতি এবং এশিয়ান গেমসে দলের শেফ দ্য মিশন মেজর ইমরোজ আহমেদ (অব.)। তবে এত বড় দল নিয়ে গেলেও পদকের টার্গেট খুবই নগণ্য। মাত্র চারটি ইভেন্টে এবার পদকের প্রত্যাশা করছে বিওএ। ইভেন্টগুলো হলো আরচারি, ক্রিকেট, শুটিং এবং কাবাডি। ব্যক্তিগত ইভেন্ট নিয়ে কোনো স্বপ্ন, প্রত্যাশা নেই। আরচারি, ক্রিকেট, শুটিং ও কাবাডিতে পদক জেতার আশা করছেন বিওএর কর্মকর্তারা। অভিজ্ঞতা অর্জন এবং ভবিষ্যতের জন্য ক্রীড়াবিদ তৈরি করার যে প্রত্যাশা- বিওএ-এর উচ্চ বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তা যথার্থই বলেছেন। কারণ বিগত দিনে যারা এ রকম পদে ছিলেন তারাও সেই একই কথা বলতেন। ফলে তাল, লয়, সুর বা স্কেলের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সবকিছুই নিয়ন্ত্রণেও নেওয়া গেছে। তবে সাংবাদিকদের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন এত বড় বহর সেই বিগত দিনের প্লেজার ট্রিপের মতোই কিনা?
আসুন, আমরা একটু বিগত এশিয়ান গেমসে আমাদের প্রাপ্তির হিসাবটা দেখি। ১৯৭৮ সাল থেকে নিয়মিতভাবে এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণ করছে বাংলাদেশ। তবে ১৯৭৮ সালে ব্যাংকক এশিয়ান গেমস এবং ১৯৮২ সালে দিল্লি এশিয়ান গেমস এই দুই আসরেই পদকশূন্য ছিল বাংলাদেশ। ১৯৮৬ সালে সিউল এশিয়ান গেমসে বক্সার মোশাররফ হোসেন লাইট হেভিওয়েটে ব্রোঞ্জ জিতে প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ¦ল করেন। এরপর গত ৩৭ বছর পর্যন্ত আর কেউ ব্যক্তিগত ইভেন্টে কোনো পদক জিততে পারেননি। এরপর যা এসেছে সবই দলগত। ’৯০ সালে বেইজিং এশিয়ান গেমসে কাবাডি থেকে দ্বিতীয় পদক আসে। পুরুষ কাবাড়ি দল রৌপ্যপদক জয়লাভ করে। পরের বার ’৯৪ সালে হিরোশিমায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসেও কাবাডি দল রৌপ্যপদক নিয়ে আসে। এরপর ’৯৮ সালে ব্যাংকক এশিয়ান গেমস থেকে জয়লাভ করে ব্রোঞ্জপদক। ২০০২ সালে বুসান থেকে ফের রৌপ্যপদক জয় করে নিয়ে আসে কাবাডি দল। ২০০৬ সালে দোহায় অনুষ্ঠিত গেমস থেকে জয় করে ব্রোঞ্জপদক। এরপর ২০১০ সালে চীনের গুয়াংজু এশিয়ান গেমসে প্রথম স্বর্ণপদক জয় করে বাংলাদেশ। এই অনন্য কৃতিত্ব বয়ে আনে পুরুষ ক্রিকেট দল। মেয়েদের দল জয় করে ব্রোঞ্জপদক। এ বছর মেয়েদের কাবাডি দল ব্রোঞ্জপদক লাভ করে। পরের বার ২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে মেয়েদের ক্রিকেট দল রৌপ্য, ছেলেদের ক্রিকেট দল ব্রোঞ্জ এবং মেয়েদের কাবাডি দল ব্রোঞ্জপদক জয়লাভ করে। ২০১৮ সালে ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে পদকবঞ্চিত ছিল বাংলাদেশ। সর্বশেষ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ দুটি ব্রোঞ্জপদক লাভ করে।
বাংলাদেশ এশিয়ান গেমসে এ পর্যন্ত একটি মাত্র স্বর্ণ পেয়েছে- সেটি ২০১০ সালে। দীর্ঘ ৩২ বছর পর স্বর্ণের দেখা মেলে। মনে করিয়ে দিই ২০১০ সালেই প্রথম এশিয়ান গেমসে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সবার এই গেমসে ক্রিকেটের লড়াই থেকে ভারত সরে দাঁড়ালে বাংলাদেশের জন্য চ্যাম্পিয়নের পথটা একটু মসৃণ হয়ে ওঠে। ২৬ নভেম্বর ফাইনালে আশরাফুলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল চ্যালেঞ্জ করে আফগানিস্তানকে। শেষমেশ বাংলাদেশ ৫ উইকেটে জয়লাভ করে এক নবতর ইতিহাস রচনা করে।
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের ব্যক্তিগত পদক প্রাপ্তি বলে তেমন কিছু নেই- যা আছে শ্রীলংকা বা নেপালেরও। সেই ’৮৬ সালে ব্রোঞ্জজয়ী একমাত্র বক্সার মোশাররফের নামটাই কেবল খোদাই করে লেখা আছে। তবে গত এশিয়ান গেমসে খানিকটা সম্ভাবনা তৈরি করেছিল বক্সার সেলিম হোসেন। প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে তাজিকিস্তানের বক্সারকে নকআউট করে আশা জাগিয়েছিলেন তিনি। হাংজু এশিয়ান গেমসে সত্যিই একটি ব্যক্তিগত পদক হাতছানি দিচ্ছিল। কোয়ার্টারে জাপানের বক্সার শুদাই হারাদাকে হারাতে পারলেই ৩৭ বছর পর এশিয়ান গেমসে একটি ব্যক্তিগত পদক নিশ্চিত হতো বাংলাদেশের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নতুন সূর্য আর ওঠেনি। তাই তো এখনও মোশাররফ নামটি অমর-অক্ষয় হয়ে আছে।
যে কোনো বড় গেমসের মূল আকর্ষণ হলো ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের লড়াই। কিন্তু এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের অবস্থা খুবই করুণ। ২০১৪ সালে ইনচন এশিয়ান গেমসে অ্যাথলেটিক্স ডিসিপ্লিনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণই ছিল না। এবার অংশগ্রহণ করবেন মাত্র দুজন ইমরানুর ও স্বপ্না। ১০০ মিটার স্প্রিন্টে লড়বেন ইমরানুর আর স্বপ্না লংজাম্পে। এ দুজন কতদূর কী করেন সেটাই দেখার বিষয়। কমনওয়েলথ গেমসে ইমরানুর ভালো করলেও স্বপ্না লংজাম্পে খুবই খারাপ করেছিল। এবারের এশিয়ান গেমসেও ব্যক্তিগত ইভেন্ট নয়, দলগত ইভেন্টকেই অগ্রগণ্য ভাবা হচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে- তা হলো এত বড় বহর কেন? তাহলে অভিজ্ঞতার কথা বলে ঘুরেফিরে আমরা কী সেই পুরনো আবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছি। বিওএ-এর কর্মকর্তারা যেসব যুক্তি তুলে বিশাল বহর নিয়ে যাচ্ছেন সেসব যুক্তি কী দেশের প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন, আকাক্সক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন অপ্রয়োজনীয় খাতে খরচ কমানোর নির্দেশ দিচ্ছেন তখন এশিয়ান গেমসে এত বড় বহর পাঠানো কতটা যুক্তিপূর্ণ? নাকি এর চেয়ে ভালো হতো বহর কমিয়ে টাকা সাশ্রয় করে উন্নতমানের কোচ-প্রশিক্ষকের পেছনে অর্থ ব্যয় করা। আশা করি বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) সহসভাপতি এবং এশিয়ান গেমসে দলের শেফ দ্য মিশন মেজর (অব.) ইমরোজ আহমেদ আগামীতে বিষয়টি গভীরভাবে ভাববেন। আসলে একজন অ্যাথলেটকে যদি পরিপূর্ণ আর্থিক সুবিধা না দেওয়া হয়, তাকে যদি উন্নতমানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না করা হয় তাহলে ভালো ফল কখনই আসবে না। তাই বেশি করে লক্ষ্যটা সেদিকে রাখুন। সেই পুরনো ফর্মুলা থেকে বেরিয়ে আসুন। অ্যাথলেটদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের পরিকল্পনা গ্রহণ করুন।
লেখক: ক্রীড়ালেখক ও গবেষক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/১০.০৯.২০২৬