একেএম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম ব্যুরো: দুই দশকের ব্যবধানে চট্টগ্রাম স্টিলস মিলসের পরিত্যক্ত জমিতে ঘটে গেছে এক নীরব বিপ্লব। পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর পাশে একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত বন্ধ স্টিল মিলের জং ধরা যন্ত্রাংশ ও পরিত্যক্ত শেড পড়ে থাকলেও সেই জমিতে এখন গড়ে উঠেছে বিশ্বমানের কারখানা। অটোমেটেড মেশিনে সেখানে তৈরি হচ্ছে উচ্চমূল্যের বিভিন্ন রপ্তানি পণ্য। গত দুই দিনে সরেজমিনে ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা কর্ণফুলী ইপিজেড ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম স্টিলস মিলসের পরিত্যক্ত জমিতে যাত্রা শুরু করে। ২০২৬ সালে এসে সেখানে সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের। দুই দশকে ইপিজেডের সীমানা বাড়েনি, কিন্তু উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও রপ্তানি আয়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ থাকলেও বর্তমানে কোনো প্লট খালি নেই। গত ২০ বছরে এই ইপিজেড থেকে মোট ১৪ দশমিক ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মোহাম্মদ তানভির হোসেনের মতে, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে একটি পরিত্যক্ত জমিও রাষ্ট্রের সম্পদে পরিণত হয়ে অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে। কর্ণফুলী ইপিজেড তার বড় উদাহরণ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল ও কর্ণফুলী নদীর কাছাকাছি ভৌগোলিক অবস্থান পণ্য পরিবহনের সময়, অর্থাৎ লিড-টাইম, অনেক কমিয়ে এনেছে। বন্দরসংলগ্ন হওয়ায় কাঁচামাল খালাস এবং তৈরি পণ্য জাহাজীকরণে কর্ণফুলী ইপিজেড বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে।
কর্ণফুলী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক বলেন, বিশাল রপ্তানি আয়ের অন্যতম কারণ পণ্যের বৈচিত্র্য। সাধারণ টি-শার্ট বা ট্রাউজার তৈরির গণ্ডি পেরিয়ে কর্ণফুলী ইপিজেড এখন উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত উৎপাদন হাবে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশ্বখ্যাত নাইকি, আডিডাস, জারা, পুমা ও এইচ অ্যান্ড এমের মতো ব্র্যান্ডের টেকনিক্যাল স্পোর্টসওয়্যার, ক্যাম্পিং টেন্ট, হাই-টেক গিয়ার, বাইসাইকেল, সেফটি জুতা ও চামড়াজাত পণ্য এখানে তৈরি হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০০৬ সালে কর্ণফুলী ইপিজেড চালুর প্রথম বছরে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অবকাঠামোগত সুবিধা, কর্ণফুলী নদী ও চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি অবস্থান এবং প্রশাসনিক দক্ষতার কারণে ধীরে ধীরে এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে পরিণত হয়।
বর্তমানে কর্ণফুলী ইপিজেডে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০০৬ সালের শুরুর বিনিয়োগের তুলনায় পরবর্তী দুই দশকে বিনিয়োগ বহুগুণ বেড়েছে। চীন, তাইওয়ান, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের উদ্যোক্তাদের ৪০টি পূর্ণাঙ্গ কারখানা বর্তমানে এখানে নিয়মিত উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।
রপ্তানির ক্ষেত্রেও কর্ণফুলী ইপিজেডের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। যাত্রার প্রথম বছরে যেখানে প্রায় ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানি হয়েছিল, সেখানে ২০০৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে ইপিজেডটির মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
বেপজার নির্বাহী পরিচালক (জনসংযোগ) আনোয়ার পারভেজ জানান, নির্মাণাধীন আরো পাঁচটি নতুন কারখানা চালু হলে কর্ণফুলী ইপিজেডে মোট প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান দ্রুতই ১ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে কর্ণফুলী ইপিজেড যে ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি করেছে, তাতে এখানে বিনিয়োগের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। তবে বর্তমানে কোনো প্লট খালি নেই।
কর্ণফুলী ইপিজেডের অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ খালিদ চৌধুরী বলেন, এ ইপিজেডের অন্যতম সুদূরপ্রসারী সামাজিক পরিবর্তন হলো নারীকর্মীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ। মোট প্রায় ৮০ হাজার কর্মীর প্রায় ৬০ শতাংশই নারী। পতেঙ্গা, হালিশহর ও চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকার সুবিধাবঞ্চিত নারীরা এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
তাঁর অভিমত, স্থানীয় আবাসন, ব্যাংক, খুচরা বাজার ও লজিস্টিকস খাত মিলিয়ে কর্ণফুলী ইপিজেডের কর্মকাণ্ডের ফলে পরোক্ষভাবে আরো দেড় লাখের বেশি পরিবার অর্থনৈতিক সুরক্ষার আওতায় এসেছে।
সূত্র জানায়, স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব কর্ণফুলী ইপিজেডের অন্যতম বড় অর্জন। ২০০৬ সালে উৎপাদন শুরুর সময় পুরো ইপিজেডে শ্রমিক ও কর্মকর্তা মিলিয়ে মোট জনবল ছিল মাত্র ১৭৪ জন। দুই দশক পর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ হাজারে।
একসময় পরিত্যক্ত পড়ে থাকা শিল্পভূমিকে পরিকল্পিত বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্রে পরিণত করার ক্ষেত্রে কর্ণফুলী ইপিজেড এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৩/৯/২০২৬