আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইনের গেজেটেও প্রকাশিত হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে কেউ তার সম্পত্তি দান করলেও জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তির ভোগ-দখলের অধিকার নিজের কাছে সংরক্ষণ করতে পারবেন। সাধারণ মানুষের জীবন ও পারিবারিক বাস্তবতার দিক থেকে দেখলে, এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি আইনগত পরিবর্তন।
আমাদের সমাজে মা-বাবা জীবিত অবস্থায় তাদের সম্পত্তি সন্তানদের নামে লিখে দেন- এমন ঘটনা খুবই স্বাভাবিক। অনেক সময় ভালোবাসা, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই তারা এমন সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সম্পত্তি হস্তান্তরের পর কোনও কোনও ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই সেই সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবহারিক অধিকার হারিয়ে ফেলেন। বিশেষ করে বার্ধক্যে এসে সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। ফলে সম্পত্তি দিয়ে দেওয়ার পরও একজন বাবা-মায়ের নিজের জীবনযাপন, বাসস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে- এমন একটি আইনগত ব্যবস্থা বাস্তব প্রয়োজনেরই প্রতিফলন।
নতুন আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এ নতুন ১২২এ ও ১২২বি ধারা সংযোজনের মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা করা হয়েছে- যেখানে দাতা সম্পত্তি হস্তান্তর করেও জীবদ্দশায় তার ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। অর্থাৎ সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও দাতার জীবনভর সম্পত্তিটি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার আইনগতভাবে সুরক্ষিত থাকবে। এই ব্যবস্থা নির্দিষ্ট ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; যেমন- মা-বাবা ও সন্তান, দাদা-দাদি, নানা-নানি ও নাতি-নাতনি এবং স্বামী-স্ত্রী।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি। নতুন এই ব্যবস্থা হেবা বা প্রচলিত দানব্যবস্থা বাতিল বা পরিবর্তন করছে না। এটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি পৃথক আইনগত পদ্ধতি। আইনের ১২২এ(৪) ধারায় স্পষ্ট করা হয়েছে, এই নতুন পদ্ধতি প্রচলিত দান, হেবা বা অন্য কোনও আইনসম্মত হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতাকে খর্ব করবে না। ফলে নতুন আইনকে হেবা বিলোপের আইন হিসেবে উপস্থাপন করা আইনের প্রকৃত বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সম্প্রতি এ নিয়ে কিছু মহল থেকে আপত্তি উঠেছে। শরিয়াহর সঙ্গে সামঞ্জস্য, উত্তরাধিকারীদের অধিকার এবং হেবা ব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নাগরিকদের কোনও আইন নিয়ে মতামত দেওয়া বা আপত্তি জানানোর অধিকার অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু কোনও আইন নিয়ে বিতর্কের ক্ষেত্রে প্রথমে দেখতে হবে আইনটি আসলে কী বলছে। ১২২এ(৪)-এর সুস্পষ্ট বিধানটি সেই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। কেউ যদি আইনের কোনও নির্দিষ্ট বিধানকে ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করেন, সেই নির্দিষ্ট প্রশ্ন নিয়ে আইনবিদ, ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনা হতে পারে। কিন্তু নতুন আইনটি হেবা নিষিদ্ধ করেছে—এমন সাধারণীকরণ আইনটির ভাষার সঙ্গে মেলে না।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতাও মনে রাখা দরকার। বাংলাদেশ বহু ধর্ম, বিশ্বাস ও মতের মানুষের দেশ। এ দেশের সংবিধান একদিকে প্রত্যেক নাগরিকের ধর্ম পালন, চর্চা ও প্রচারের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। অপরদিকে সম্পত্তি অর্জন, ধারণ ও হস্তান্তরের অধিকারও স্বীকার করেছে। সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদ ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ৪২ অনুচ্ছেদ সম্পত্তির অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। তাই সম্পত্তি হস্তান্তরের মতো একটি আইনকে কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর বৃহত্তর আইনগত ও মানবিক তাৎপর্যটি আড়ালে পড়ে যেতে পারে। নতুন আইনটি কোনও ধর্মীয় বিধান বাতিল করার জন্য করা হয়নি; বরং পারিবারিক সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে একটি অতিরিক্ত আইনগত পথ তৈরি করেছে।
আরেকটি মৌলিক বিষয় হলো- জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তর এবং মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার এক বিষয় নয়। একজন ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় আইনসম্মতভাবে নিজের সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন। অপরদিকে তার মৃত্যুর সময় তার নামে যে সম্পত্তি থাকবে, তা প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইনের অধীনে বিবেচিত হবে। এই পার্থক্যটি স্পষ্টভাবে বোঝা জরুরি। কারণ জীবিত অবস্থায় নিজের সম্পত্তি সম্পর্কে একজন ব্যক্তির আইনসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের অধিকার—দুটিকে এক করে দেখলে নতুন আইনটির উদ্দেশ্য ও প্রয়োগ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
নতুন আইনের ১২২বি ধারাতেও গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা রাখা হয়েছে। নিবন্ধনের পর এই ধরনের হস্তান্তর সাধারণভাবে প্রত্যাহারযোগ্য নয়। তবে আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য কোনও প্রকৃত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মতিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে পরিবর্তন বা প্রত্যাহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে, যেমন- কোনও পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অক্ষম বা আইনগতভাবে সম্মতি দিতে অসমর্থ হলে আদালতের হস্তক্ষেপের সুযোগও রয়েছে। ফলে আইনটি সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইনি প্রতিকারের পথও রেখেছে।
অবশ্য আইনের সুফল নিশ্চিত করতে এর প্রয়োগে সতর্কতা প্রয়োজন। সম্পত্তি হস্তান্তরের সময় দাতার স্বাধীন ও স্বেচ্ছাসম্মতি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতারণা, চাপ, ভয় দেখানো বা পারিবারিক প্রভাব খাটিয়ে যেন কেউ সম্পত্তি হস্তান্তরে বাধ্য না হন, সে বিষয়ে নিবন্ধন কর্তৃপক্ষকে যথাযথভাবে সতর্ক থাকতে হবে। একইসঙ্গে পরিবারের অপেক্ষাকৃত দুর্বল সদস্যদের স্বার্থ যেন অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। আইনটির বিধান, সুযোগ ও প্রতিকার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাও জরুরি।
বাংলাদেশের মতো বহু ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষের দেশে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি সম্মান যেমন জরুরি, তেমনই প্রত্যেক নাগরিকের আইনগত অধিকার ও সম্পত্তির স্বাধীনতাও গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানের ৪১ ও ৪২ অনুচ্ছেদ সেই ভারসাম্যেরই প্রতিফলন। নতুন আইনটি কোনও ধর্মীয় বিধানকে অস্বীকার না করে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি পৃথক আইনগত পথ তৈরি করেছে। ফলে এর মূল্যায়ন হওয়া উচিত এর প্রকৃত বিধান, সাংবিধানিক কাঠামো এবং মানুষের বাস্তব জীবনে এর সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাবের আলোকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একজন মানুষ তার জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি সম্পর্কে নিজের ইচ্ছায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখেন। একইসঙ্গে সেই সিদ্ধান্তের কারণে তার নিজের জীবন যেন অনিরাপদ হয়ে না পড়ে, সেটিও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। নতুন আইনটি এই দুই বাস্তবতার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য তৈরি করেছে- সম্পত্তি হস্তান্তরের স্বাধীনতা এবং জীবনের শেষ পর্যায়ে ভোগদখল ও নিরাপত্তার অধিকার। একজন বাবা-মা যদি ভালোবেসে সন্তানকে সম্পত্তি দিতে চান, তাকে সেই সুযোগ দেওয়া যেমন মানবিক, তেমনই সম্পত্তি দেওয়ার পরও যেন তিনি নিজের ঘরে, নিজের সম্পত্তির ভোগে এবং নিজের মর্যাদায় জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাতে পারেন, তা নিশ্চিত করাও সমান মানবিক। নতুন সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব এখানেই।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/১০.০৯.২০২৬