‘নো নাবি, নো প্রোবলেম’—ধারাভাষ্যে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে চিৎকার করে বললেন ইয়ান বিশপ। জাতীয় দলের ডাকে মোহাম্মদ নাবি ফিরে যাওয়ার পর গায়ানার শিবিরে দুর্ভাবনার যথেষ্ট কারণই ছিল। তবে মেহেদী হাসান মিরাজ যেন সেই দুর্ভাবনা পুরোপুরি ভুলিয়েই দিলেন।
বোলিংয়ে এসে প্রথম ওভারেই টানা দুই বলে উইকেট তুলে নেওয়ার পরই ধারাভাষ্যে ভেসে আসে বিশপের সেই উচ্ছ্বসিত উচ্চারণ। তবে সেখানেই শেষ নয়, পরবর্তীতে আরও দুটি উইকেট শিকার করে দলের জয়ের ভিত গড়ে দিয়ে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতে নেন বাংলাদেশের এই অলরাউন্ডার।
সিপিএলে গায়ানা অ্যামাজন ওয়ারিয়র্সের হয়ে চার ওভারে মাত্র ২৩ রান দিয়ে চারটি উইকেট শিকার করেন মিরাজ, তার চারটি শিকারই ছিল বোল্ড। বিধ্বংসী ব্যাটিং লাইনআপ নিয়ে খেলতে নামা ত্রিনবাগো নাইট রাইডার্সকে ছয় উইকেটে হারিয়েছে তার দল গায়ানা। উল্লেখ্য, এর আগের ম্যাচেই সিপিএলে অভিষেক ঘটিয়ে ১৩ রানে তিন উইকেট শিকার করে দলের জয়ে বড় অবদান রেখেছিলেন মিরাজ।
এই দুই ম্যাচেই দুর্দান্ত বোলিংয়ের পাশাপাশি মিরাজের উদযাপনও ছিল বেশ নজরকাড়া।
তাৎক্ষণিক উচ্ছ্বাসে ছুটে চলা, আঙুল উঁচিয়ে লাফিয়ে ওঠা—এসবের পাশাপাশি মিরাজ ফিরিয়ে এনেছেন সেই পরিচিত ‘নাগিন ডান্স’। দুই ম্যাচেই মূলত অধিনায়ক ইমরান তাহিরের সঙ্গে উদযাপনের সময় এই ‘নাগিন ডান্সে’র রূপে দেখা গেছে তাকে, আর তার সঙ্গে ‘নাগিন’ নাচে মেতেছেন তাহিরও। এই ‘নাগিন ডান্স’ একসময় বাংলাদেশের ক্রিকেটে ছিল তুমুল আলোচিত একটি উদযাপন।
বিশেষ করে ২০১৮ সালে শ্রীলঙ্কায় নিদাহাস ট্রফির সময় থেকেই এই উদযাপন একই সঙ্গে হয়ে উঠেছিল বিখ্যাত ও কুখ্যাত। দীর্ঘদিন পর কোনো বড় মঞ্চে আবারও দেখা মিলল এই উদযাপনের।
তবে উদযাপন এখানে কেবলই একটি অনুষঙ্গ মাত্র, তার প্রকৃত বোলিং পারফরম্যান্সই ছিল মূল আলোচনার বিষয়। গায়ানার উইকেট বেশ মন্থর, বল গ্রিপ করছে এবং টার্নও মিলছে যথেষ্ট। স্পিন সহায়ক এই উইকেটের ধরন বুঝে গতি ও লেংথের বৈচিত্র্যে দুর্দান্ত বোলিং করে চলেছেন মিরাজ।
উল্লেখযোগ্য বিষয়, ১৭৮ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো এক ম্যাচে চার উইকেট শিকারের কীর্তি গড়লেন মিরাজ, আর দেশের বাইরে এই স্বাদ পেলেন তিনি এটাই প্রথমবার। টি-টোয়েন্টিতে দেশের বাইরে ম্যাচসেরা হওয়ার তালিকাতেও এই নিয়ে ১১ বার নাম উঠল তার।
এর আগে দেশের বাইরে ম্যাচসেরা হয়েছিলেন কেবল একবারই—২০২২ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এক ম্যাচে, যেখানে মূলত তার ব্যাটিং পারফরম্যান্সের কারণেই এই স্বীকৃতি জোটে। বাংলাদেশ সময় শনিবার সকালে শেষ হওয়া এই ম্যাচে প্রভিডেন্স স্টেডিয়ামে টস জিতে প্রথমে বোলিংয়ে নামে গায়ানা। ত্রিনবাগোকে ভালো একটি শুরু এনে দেন টি-টোয়েন্টির দুই সফল ও অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান কলিন মানরো ও অ্যালেক্স হেলস।
চার ওভারে ৩৮ রান তোলার পর মিরাজকে আক্রমণে নিয়ে আসেন অধিনায়ক তাহির, আর সাফল্যও মেলে ওভারের চতুর্থ বলেই। মানরো সুইচ হিট খেলবেন—এই বিষয়টি আগেভাগেই বুঝতে পেরে বুদ্ধিদীপ্তভাবে বল অনেকটা ভাসিয়ে ও লেংথ টেনে বল করেন মিরাজ, আর বল ছোবল দেয় স্টাম্পে।
ফলে ১৬ বলে ২৬ রান করে সাজঘরে ফেরেন এই কিউই ব্যাটসম্যান। পরের ডেলিভারিতে আসা উইকেটটি আরও বড়। রাউন্ড দা উইকেটে দারুণ ফ্লাইট ও লেংথের সাহায্যে নিকোলাস পুরানের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর একটি অ্যাঙ্গল তৈরি করেন মিরাজ। ত্রিনবাগো অধিনায়ক ধৈর্যের পরিচয় না দিয়ে প্রথম বলেই বড় শট খেলার চেষ্টা করেন, আর বল গিয়ে আঘাত করে মিডল স্টাম্পে।
মিরাজের এই জোড়া ধাক্কায় ত্রিনবাগোর রানের গতিও প্রায় থমকে যায়। পরের চার ওভারে আসে মাত্র ১৩ রান। তখনও টিকে থাকা অ্যালেক্স হেলসকেও ২২ রানে ফিরিয়ে দেন তাহির। প্রথম দুই ওভারে ১০ রান খরচ করা মিরাজ আবার বোলিংয়ে আসেন ত্রয়োদশ ওভারে, আর তৃতীয় উইকেটও পেয়ে যান এই ওভারেই—যা সম্ভবত ছিল ম্যাচে তার সেরা ডেলিভারি। যথারীতি রাউন্ড দা উইকেটে একটি আর্ম বল করেন তিনি।
লেংথ বলটি পিচ করে সোজা হয়ে বাঁহাতি জাইড গুলির প্যাড-ব্যাটের ফাঁক গলে উড়িয়ে দেয় বেলস। মিরাজের পরের শিকার সুনিল নারাইন। ঝুলিয়ে দেওয়া বলে বড় শট খেলার চেষ্টায় ব্যাটে-বলেই করতে পারেননি এই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান।
তবে এই ওভারেই জাস্টিন গ্রেভসের ব্যাটে একটি ছক্কা হজম করতে হয় মিরাজকে। তারপরও ওভারপ্রতি ছয়ের কম রান দিয়ে বোলিং করেন তিনি। গ্রেভসের করা ৩৫ রানই ছিল ত্রিনবাগোর ইনিংসে সর্বোচ্চ। শেষ পর্যন্ত তাদের ইনিংস থেমে যায় ১২৬ রানে। মিরাজের চার উইকেট ছাড়াও মন্থর উইকেটে গতির ঝড় তুলে দুটি উইকেট শিকার করেন শামার জোসেফ। এর আগের ম্যাচেই পাঁচ উইকেট নিয়ে রেকর্ড গড়া তাহির এবার নেন একটি উইকেট।
রান তাড়া করতে নেমে গায়ানা খুব বেশি দাপট দেখাতে না পারলেও তেমন কোনো বেগও পেতে হয়নি তাদের। ওপেনিংয়ে মাভেন্দ্রা ডিন্ডিয়াল দুটি ছক্কার সাহায্যে ১৪ বলে ১৯ রান করে আউট হন। আরেক ওপেনার গ্লেন ফিলিপস অবশ্য তেমন ভালো করতে পারেননি, ১৮ বলে করেন মাত্র ১১ রান। তিনটি ছক্কার মারে ১৯ বলে ২৮ রান করে আউট হন শিমরন হেটমায়ার। বোলিংয়ে সফল হলেও ব্যাটিংয়ে ধুঁকেছেন মিরাজ নিজে।
১৪টি বল মোকাবিলা করে মাত্র দুই রান করে আউট হন তিনি। তবে অভিজ্ঞ শেই হোপ ৩৫ বলে অপরাজিত ৪২ রান করে দলের জয় নিশ্চিত করেই মাঠ ছাড়েন। শেষ পর্যন্ত ৮ বল হাতে রেখেই ম্যাচ শেষ করে গায়ানা। ইতোমধ্যে প্লে-অফ নিশ্চিত করে ফেলা গায়ানা ৯ ম্যাচের মধ্যে ৮টিতে জয় নিয়ে নিজেদের শীর্ষস্থান আরও সংহত করল। প্রাথমিক পর্বে তাদের আর একটি ম্যাচ বাকি রয়েছে, যা তারা খেলবে বারবাডোজ ট্রাইডেন্টসের বিপক্ষে।
ডিসি/আপ্র/১২/০৯/২০২৬