কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেলের অপব্যবহার ঠেকাতে সম্ভাব্য জৈবিক অস্ত্র গবেষণার সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যক্তির তৎপরতা শনাক্ত করে তা বন্ধ করেছে মার্কিন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের এআই মডেল ব্যবহার করে সম্ভাব্য জৈবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার সঙ্গে জড়িত একাধিক গবেষকের কার্যক্রম শনাক্ত করার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ বৃহস্পতিবার) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অ্যানথ্রপিক বলেছে, এআই অপব্যবহারের বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকির মধ্যে জৈবিক অপব্যবহার তাদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন ও উন্নত এআই মডেলগুলো বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আরো দক্ষ হয়ে ওঠায় এ ধরনের ঝুঁকি বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে তাদের বিভিন্ন এআই মডেলকে জৈবিক অস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহারের পাঁচটি ঘটনা, সেগুলো শনাক্ত হওয়ার পদ্ধতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
অ্যানথ্রপিকের ভাষ্য, জৈবিক গবেষণার সম্ভাব্য অপব্যবহার শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ নতুন টিকা বা চিকিৎসা আবিষ্কারের গবেষণা এবং কোনো জৈবিক অস্ত্র তৈরির প্রক্রিয়ার কিছু ধাপ ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ধরন অনেকটা একই রকম হতে পারে। ফলে কোনো গবেষণার উদ্দেশ্য ক্ষতিকর কি না, তা শুধু ব্যবহৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি দেখে নির্ধারণ করা সব সময় সম্ভব নয়।
তবে সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতির কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি ঘটনায় অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অ্যানথ্রপিকের হুমকি গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান জ্যাকব ক্লেইন বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে কেউ সরাসরি ঘোষণা করে না যে সে মানুষ হত্যার জন্য জৈবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায়। তাঁর ভাষায়, এসব পরিস্থিতি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল।
অ্যানথ্রপিকের শনাক্ত করা একটি ঘটনায় দেখা যায়, গত মে মাসে তাদের জৈবিক নিরাপত্তা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চিকুনগুনিয়া ভাইরাস নিয়ে জীববৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনসংক্রান্ত গবেষণার জন্য একটি অনুদানের আবেদন লেখার অনুরোধ শনাক্ত করে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, চিকুনগুনিয়ার কোনো অনুমোদিত চিকিৎসা নেই এবং ভাইরাসটি আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে সপ্তাহ বা মাসব্যাপী গুরুতর উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে।
জীববৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনসংক্রান্ত গবেষণায় কোনো জীবের জিনগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করা হয়। ওই নির্দিষ্ট গবেষণা প্রস্তাবে ভাইরাসটির সংক্রমণক্ষমতা এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে এড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় ছিল। গবেষণাটির সঙ্গে একটি সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা থাকায় অ্যানথ্রপিকের কাছে বিষয়টি আরো উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে।
আরো কয়েকটি ঘটনায় বার্ড ফ্লু বা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে একই ধরনের গবেষণা এবং বিষাক্ত পেপটাইডের তথ্যভান্ডার ও বিষের বৈশিষ্ট্য উন্নত করার জন্য প্রজন্মক্ষম প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা তৈরিতে একজন গবেষকের অ্যানথ্রপিকের এআই মডেল ব্যবহারের বিষয়টি উঠে আসে। এসব ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য অপব্যবহারের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আপত্তি জানায়।
অ্যানথ্রপিকের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে জৈবিক অপব্যবহারের পাশাপাশি সফটওয়্যার দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া, প্রচারণামূলক কার্যক্রম এবং অস্ত্রব্যবস্থা তৈরিসহ এআই মডেলের অপব্যবহারের আরো কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তাদের এআই মডেলের অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের হিসাব নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসব তদন্ত থেকে পাওয়া তথ্য ভবিষ্যতে মডেলের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো উন্নত করা এবং একই ধরনের অপব্যবহার প্রতিরোধে কাজে লাগানো হচ্ছে।
তবে সম্ভাব্য জৈবিক অস্ত্র তৈরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেনি অ্যানথ্রপিক। এর কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা পেশাদার বিজ্ঞানী। তাঁদের ক্ষতিকর উদ্দেশ্য ছিল বলে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করছে না। বরং তাঁদের বা তাঁদের গবেষণাগারের পরিচয় প্রকাশ করা হলে তাঁরা নিজেরাই ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।
এআই যখন বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে দ্রুততর ও আরো সক্ষম করে তুলছে, তখন একই প্রযুক্তি যাতে বিপজ্জনক গবেষণা বা অপব্যবহারের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, সেটিই এখন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
সানা/আপ্র/১২/৯/২০২৬